খুলনার উপকূলীয় জনপদের প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রায় মৌলিক পরিবর্তন আনছে স্থানীয় পর্যায়ের বেশ কিছু ক্ষুদ্র কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ। প্লাস্টিকের জার, টিনের কৌটা ও কাচের বোতলের মধ্যে যত্ন করে দেশীয় বীজ সংরক্ষণ এখন শুধু চাষাবাদের মাধ্যম নয়, এটি নারীদের ক্ষমতায়ন ও খাদ্য সার্বভৌমত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে। বটিয়াঘাটা উপজেলার শুকদারা গ্রামের করুণা মণ্ডলের কাছে ধান, শাকসবজি, ফল, ফুল ও ঔষধি মিলিয়ে বর্তমানে ৩১৬ প্রকারের বীজ রয়েছে। পূর্বে এ অঞ্চলের নারীরা বংশপরম্পরায় বীজ সংরক্ষণ করলেও সেটি ছিল বিচ্ছিন্ন, কোনো সংগঠিত কাঠামো ছিল না। এর ফলে দেশীয় জাতগুলো বিলুপ্ত হচ্ছিল এবং কৃষকেরা হাইব্রিড বীজের জন্য বড় কোম্পানির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন।

এই পরিস্থিতি বদলাতে ২০১০ সালে স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা ‘লোকজ’ বটিয়াঘাটার গঙ্গারামপুরে কয়েকজন নারীকে সঙ্গে নিয়ে কাজ শুরু করে। প্রশিক্ষণ, সংরক্ষণ কৌশল, নিয়মিত বীজ বিনিময় ও বার্ষিক বীজমেলার মাধ্যমে এই আন্দোলন চারটি ইউনিয়নের ১৭টি গ্রাম ও দাকোপ উপজেলার এক গ্রামে বিস্তার লাভ করে। করুণা মণ্ডলের ভাষায়, আগে তিনি শুধু সংসারের প্রয়োজনেই বীজ তুলে রাখতেন, কিন্তু এখন তিনি জানেন এগুলো পুরো গ্রামের সম্পদ। এখন আর বীজের জন্য বাজারে ছুটতে হয় না, বরং অতিরিক্ত বীজ বিক্রি করে অর্থ উপার্জনের পথ তৈরি হয়েছে। একই উপজেলার ঝড়ভাঙা গ্রামের লক্ষ্মী রানী মণ্ডলের ‘লক্ষ্মী বীজ ভাণ্ডারে’ প্রায় ৪৭০ জাতের বীজ সংরক্ষিত আছে। তিনি জানান, বার্ষিক বীজমেলায় যেয়ে নতুন জাত সংগ্রহ ও নিজের সংগ্রহ ভাগাভাগি করার ফলে গ্রামের হারিয়ে যাওয়া অনেক পুরনো দেশীয় জাত আবার জমিতে ফিরে এসেছে। হালিয়া গ্রামের ইতিকা রায় ৯৪ জাতের দেশীয় বীজ সংগ্রহ করেছেন এবং জানালেন, দেশীয় ফসলে রোগবালাই কম হওয়ার কারণে কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমে গেছে, এতে উৎপাদন ব্যয়ও হ্রাস পেয়েছে।

অপরদিকে, নবীকরণযোগ্য পানি সংগ্রহ এখন আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। খুলনার উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট প্রকট, যার প্রধান কারণ হলো ভূগর্ভস্থ পনির অতিরিক্ত লবণাক্ততা ও আর্সেনিক। দাকোপ উপজেলার সুতারখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাসুম আলী ফকির জানান, এনজিওগুলি এ সংকট মোকাবিলায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ট্যাংক ব্যাপকহারে বিতরণ করেছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) তথ্য অনুযায়ী, একক উপজেলাতে গত পাঁচ বছরে প্রায় ৫,৮২৬টি রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম বসানো হয়েছে, এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা আরও প্রায় দশ হাজার সিস্টেম বিতরণ করেছে। মল্লিকপাড়া গ্রামের সেলিনা বেগম ২,০০০ লিটারের একটি ট্যাংক পাওয়ার পর তার কষ্ট অনেকটাই কমে গেছে, কারণ প্রতিবন্ধী সন্তানদের নিয়ে দূর থেকে পানি আনতে তার কষ্ট হতো। একইভাবে বাইনপাড়া গ্রামের অনিজা বেগম, যিনি খেয়ানৌকার মাঝি, তার পরিবারেও নিরাপদ পানির সংস্থান হয়েছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতেও বেসরকারি সংস্থাগুলির কার্যক্রম সুদূরে প্রসারিত। রূপসা উপজেলার তিলক গ্রামে অবস্থিত সিএসএস-এর রেভারেন্ড আব্দুল ওয়াদুদ মেমোরিয়াল হাসপাতাল একটি উদাহরণ, যা স্থানীয় বাসিন্দা সাত্তার শেখের মতে দূরদূরান্তের মানুষকে উন্নত চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে। সংস্থাটি ঠোঁট ও তালুকাটা রোগীদের বিনামূল্যে অস্ত্রোপচার, এইচআইভি আক্রান্তদের পুনর্বাসন, কুষ্ঠ ও চক্ষুসেবার মতো বিশেষায়িত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সুন্দরবন একাডেমির প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদিরের মতে, খুলনার এনজিওগুলো মূলত ক্ষুদ্রঋণ ভিত্তিক ও প্রকল্পভিত্তিক। বিশেষ করে পানি, জলবায়ু পরিবর্তন ও জীবিকার ক্ষেত্রে প্রকল্পভিত্তিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল করিম বলেন, উপকূলের মানুষর জন্য এনজিওগুলি ভালো কাজ করলেও সমন্বয়হীনতায় কখনো কখনো একই ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখা যায়।

জেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, খুলনায় নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী ও সমাজকল্যাণ সংস্থার সংখ্যা ১,৩৮০টি, তবে তার মধ্যে ৪২টি সংস্থার কার্যক্রম বর্তমানে নেই। জেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রায় ৭০টি উন্নয়ন সংস্থা এখন খুলনায় সক্রিয়। এদের মধ্যে রয়েছে সিএস, রূপান্তর, উত্তরণ, ব্র্যাক, ওয়ার্ল্ড ভিশন, কেয়ার বাংলাদেশ ও ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটির মতো সংস্থাগুলি। প্রশাসন এই বৃহৎ কর্মযজ্ঞে সমন্বয় বজায় রাখতে নিয়মিত সভার আয়োজন করে আসছে।