চট্টগ্রাম শহরের নৈসর্গিক রূপ যেন অন্য মাত্রা দেয়। পাহাড়, নদী ও সমুদ্রের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন দেখতে পাওয়া যায় নীল আকাশ থেকে। বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি, কর্ণফুলী নদীর বাঁকানো পথ আর সবুজ পাহাড়ের চূড়াগুলো একসঙ্গে দৃষ্টি কাড়ে। এই অনন্য ভৌগোলিক সমন্বয় পৃথিবীর আর কোনো শহরে চোখে পড়ে না বলে মনে করেন স্থানীয়রা। প্রবাস থেকে ফেরা প্রতিটি মানুষের মনে দাগ কাটে শহরটির এই অপার সৌন্দর্য। কিন্তু এই সৌন্দর্যের মাঝেই লুকিয়ে আছে নাগরিক জীবনের এক দীর্ঘ কষ্টের তালিকা।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চট্টগ্রামের নাগরিক সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন করলেই ভেসে ওঠে দীর্ঘ এক তালিকা। জলাবদ্ধতা শহরের অন্যতম প্রধান সমস্যা। আগ্রাবাদ, চকবাজার, বাকলিয়া, হালিশহর, চান্দগাঁও, পতেঙ্গা ও কুয়াইশ এলাকায় টানা বৃষ্টি আর জোয়ারের পানিতে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে থাকে। কোথাও পানি নামতে পুরো এক সপ্তাহ লেগে যায়। ভাঙা সড়কও কম সমস্যা নয়। মুরাদপুর-অক্সিজেন সড়কসহ নগরীর প্রায় ১৯৭ কিলোমিটার সড়ক গর্তে ভরা। এগুলো মেরামতে প্রয়োজন ৩৪৮ কোটি টাকা, কিন্তু বরাদ্দ এসেছে মাত্র ২২ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শহরের রাস্তাগুলোর আইডি নম্বর না থাকায় কোন সড়কে কী কাজ হচ্ছে, কত টাকা বরাদ্দ হচ্ছে তা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ফলে জনগণ নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গর্তে পড়ে গাড়ি নষ্ট হওয়া এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে।

যানজট তো আছেই, সঙ্গে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট তো নিত্যদিনের সঙ্গী। এলএনজি টার্মিনাল রক্ষণাবেক্ষণ ও আমদানি সংকটের কারণে চট্টগ্রামে দৈনিক প্রায় ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি চলছে। এর প্রভাব পড়েছে সিইউএফএল সার কারখানা, বিভিন্ন ইস্পাত, সিমেন্ট ও পোশাক কারখানার উৎপাদনে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় জ্বালানিসংকটের কারণে তীব্র লোডশেডিং হচ্ছে। শহর ও গ্রামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন বিপর্যস্ত। এছাড়াও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পাহাড় কাটা ও দখল, নিম্নমধ্যবিত্তের আবাসন সংকট, দুর্বল নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি শহরের বাসিন্দাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। অভিযোগ জানানোর নতুন অ্যাপ চালু হলেও মাঠপর্যায়ে সমাধানের গতি ধীর। সাত দিনে এক হাজার অভিযোগের মধ্যে মাত্র ২৬৭টি সমাধান করা সম্ভব হয়েছে। এসব সমস্যার মাঝেও চট্টগ্রামের এক নাগরিকের উক্তি—‘যায় দিন ভালো...’।