লিওনেল স্কালোনির গল্প আর্জেন্টিনা ফুটবলের এক আধুনিক রূপকথা। ২০১৮ সালের আগস্টে, দেশটির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন যখন চরম আর্থিক সংকটে জর্জরিত, তখন কোনো বড় নামি কোচকে দলে ভেড়ানোর সামর্থ্য তাদের ছিল না। অগত্যা বাধ্য হয়েই তৎকালীন সহকারী কোচ স্কালোনিকে অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই সময় এই সিদ্ধান্ত তুমুল সমালোচনার ঝড় তোলে। ফুটবল সম্রাট দিয়েগো ম্যারাডোনা পর্যন্ত মন্তব্য করেন, স্কালোনি হয়তো রাস্তায় ট্রাফিকও ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না।

তবে স্কালোনি ধীরে ধীরে সব সমালোচনার জবাব দিয়েছেন মাঠের পারফরম্যান্সে। আগে আর্জেন্টিনা দীর্ঘ শিরোপাখরার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ১৯৯৩ সালের কোপা আমেরিকা জয়ের পর থেকে ২৮ বছরে কোনো বড় শিরোপা উঠে যায়নি তাদের ঘরে। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে হার, পরপর দুই কোপা আমেরিকা ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হেরে যাওয়া—এসব আর্জেন্টাইন ফুটবলে এক বিষাদের সুর এনে দিয়েছিল। অধিনায়ক লিওনেল মেসির অশ্রুতে ভিজে গিয়েছিল নীল-সাদা জার্সির গৌরব।

স্কালোনি দলের হাল ধরেন নীরবে। তিনি ভাঙা মনোবলকে সংগঠিত করেন, তরুণ প্রতিভাদের ওপর ভরসা রাখেন এবং নিজের ডাগআউটে এক দৃঢ় আস্থার পরিবেশ তৈরি করেন। দলটি 'লা স্কালোনেতা' নামে পরিচিতি পায়। ২০১৯ সালে কোপা আমেরিকার সেমিফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হারের পরও তিনি দলের প্রতি আস্থা রাখেন। এরপর শুরু হয় দলের অপরাজিত যাত্রা, যা টানা ৩৬ ম্যাচ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

মারাকানা স্টেডিয়ামে ২০২১ কোপা আমেরিকার ফাইনাল ছিল টার্নিং পয়েন্ট। ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনা ২৮ বছর পর শিরোপা ফিরে পায়। একই বছরে ফিনালিসিমায় ইতালিকে ৩-০ গোলে হারিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিপত্তি আরও মজবুত হয়। সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে। কাতার বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কাছে হারের পর সবাই যখন আর্জেন্টিনাকে ছাড় দিয়েছিল, স্কালোনির দল তখন ঘুরে দাঁড়ায়। একে একে মেক্সিকো, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে ফাইনালে ফ্রান্সের মুখোমুখি হয়। অতিরিক্ত সময় ও টাইব্রেকারের পর আর্জেন্টিনা ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ জিতে নেয়।

এই সাফল্য থেমে থাকেনি। ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় কলম্বিয়ার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে জয় পেয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো দক্ষিণ আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে আর্জেন্টিনা। স্কালোনির অধীনে দল শুধু ট্রফি জিতেছে তা নয়, বরং একটি অদম্য মানসিকতা ও জয়ী অভ্যাস গড়ে তুলেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। সেমিফাইনালে পৌঁছে সেই 'লা স্কালোনেতা' আবারও শিরোপার স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

যে কোচের ওপর একসময় এতই সন্দেহ ছিল যে তাকে বিশ্বসেরা বানানোর কাজ করার জন্য যোগ্য মনে করা হতো না, সেই মানুষটি এখন দাঁড়িয়ে আছেন আর্জেন্টিনা ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যানেজার হিসেবে। তার সাফল্যের পথ মোটেই মসৃণ ছিল না, কিন্তু পথটাই আজ তাকে মহত্ত্বের আসনে বসিয়েছে। পুরো আর্জেন্টাইন জাতির চোখ এখন বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচগুলোর দিকে। সমর্থকদের বিশ্বাস, স্কালোনি আবারও তার জাদু দেখাবেন।