একসময় ফুটবলারদের আলাদা পরিচিতি তৈরি হতো চুলের স্টাইল, ট্যাটু বা পোশাকের মাধ্যমে। বর্তমানে সেই পরিচিতি গড়ে ওঠে চিকিৎসকের চেম্বারে। শিল্পী, ইনফ্লুয়েন্সার ও টেলিভিশন তারকাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয় ফেসিয়াল হারমোনাইজেশন বা মুখাবয়বের সৌন্দর্যবর্ধক চিকিৎসা এখন ফুটবলারদের কাছেও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তবে বিষয়টি শুধু সৌন্দর্যচর্চায় সীমাবদ্ধ নয়; বর্তমান যুগে একজন ফুটবলার একইসঙ্গে খেলোয়াড়, ইনফ্লুয়েন্সার এবং একটি ব্র্যান্ড। ফলে তাঁর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির অর্থনৈতিক মূল্যও তৈরি হয়েছে।
আগে ফুটবল মানেই ছিল ৯০ মিনিটের খেলা। এখন ফুটবলাররা প্রায় সবসময় আলোচনায় থাকেন। সেলফি, সাক্ষাৎকার, সরাসরি সম্প্রচার, প্রামাণ্যচিত্র ও ক্লাবের তৈরি বিভিন্ন কনটেন্ট তাঁদের উপস্থিতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই কারণে ফেসিয়াল হারমোনাইজেশনকে শুধু আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর উপায় নয়, বরং ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি গড়ে তোলার কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ভিভিয়ান সিমোয়েস পিরেস, যিনি একাধিক ফুটবলারের চিকিৎসা করেছেন, তিনি বলেন, “আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তাঁরা শুধু সুন্দর দেখানোর জন্য নয়, বরং পেশাগত উন্নতি ও আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর লক্ষ্যেও এসব চিকিৎসা নেন। অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই ফেসিয়াল হারমোনাইজেশনের পর চাকরি বদল, পদোন্নতি কিংবা নতুন সুযোগ এসেছে। তাই বিষয়টি শুধু ফুটবলে নয়, সব পেশাতেই প্রযোজ্য।”
তবে আসল প্রশ্ন হলো—একজন মানুষ নিজের ভালোলাগা, আত্মবিশ্বাস বা ব্যক্তিত্ব প্রকাশের জন্য এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, নাকি সমাজের তৈরি একটি নির্দিষ্ট সৌন্দর্যের ছাঁচে নিজেকে মানিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড গড়ে তোলার অর্থ শুধু সুন্দর দেখা নয়, বরং একজন মানুষ যে কাজটি সবচেয়ে ভালো পারেন, সেটিকে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরা এবং দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা। ব্র্যান্ডিং ও সুনাম ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ জুলিয়ানা ট্রানকুইলিনি বলেন, “অ্যাথলেটদের শুধু সুন্দর দেখালেই চলবে না। তাদের এমন একটি গল্প বলতে হবে, যা মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করবে। মাঠে তাদের আচরণ, ব্যক্তিত্ব ও স্বাভাবিক প্রতিভাও তুলে ধরতে হবে।” যে কারণে ভিনিসিয়ুসের সঙ্গে চুক্তি নবায়নে এত মরিয়া রিয়াল, এই প্রবণতা খেলাধুলার জগতে বড় পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।
আধুনিক ফুটবলারদের এখন আর শুধু গোল, অ্যাসিস্ট বা ট্রফি দিয়ে মূল্যায়ন করা হয় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের সম্পৃক্ততা তৈরি, স্পনসর আকর্ষণ এবং নিজের ব্র্যান্ডকে শক্তিশালী করার ক্ষমতাও তাদের বড় আর্থিক সম্পদে পরিণত হয়েছে। জুলিয়ানা আরও বলেন, “আজকের দিনে একজন ফুটবলারের মূল্যায়ন শুধু মাঠের পারফরম্যান্সে সীমাবদ্ধ নয়। দলে জায়গা পেতে অবশ্যই ভালো খেলতে হবে। কিন্তু একজন খেলোয়াড়ের ব্র্যান্ড গড়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, সাক্ষাৎকারে, বাণিজ্যিক অংশীদারত্বে এবং ভক্তদের সঙ্গে তার সম্পর্কের মধ্য দিয়েও।”
রিয়াল মাদ্রিদ ও ব্রাজিল জাতীয় দলের ফরোয়ার্ড ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মুখাবয়বের পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর ফেসিয়াল হারমোনাইজেশন নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়। তাঁর পাশাপাশি ফ্ল্যামেঙ্গোর ডিফেন্ডার লেও পেরেইরা, করিন্থিয়ান্সের ফরোয়ার্ড পেদ্রো রাউল এবং বার্সেলোনার ফরোয়ার্ড রাফিনিয়ার মতো আরও অনেক ফুটবলারের চেহারার পরিবর্তনও আলোচনায় এসেছে। সার্জারির মাধ্যমেও অবয়বে পরিবর্তন এনেছেন জোয়েলিংটনের মতো খেলোয়াড়েরা। তবে এ ধরনের সৌন্দর্যবর্ধক চিকিৎসা নিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে বেশির ভাগ ফুটবলারই মুখ খুলতে চান না। অনেকেই আবার বিষয়টি স্বীকারও করেন না। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিলেন ব্রাজিল জাতীয় দলের সাবেক মিডফিল্ডার ও সান্তোস–পালমেইরাসের সাবেক খেলোয়াড় লুকাস লিমা। নিজের চেহারার পরিবর্তন নিয়ে তিনি খোলাখুলিই কথা বলেছেন। লুকাস লিমা বলেন, “ফেসিয়াল হারমোনাইজেশনের আগের ও পরের ছবি আমার কাছে আছে। অনেক আগেই আমি কান ও মুখাবয়বের কিছু পরিবর্তন করিয়েছি। এখন অবশ্য দাড়ি বড় হয়েছে, আর একজন পুরুষের জন্য দাড়িও একধরনের হারমোনাইজেশন। বিষয়টি আমি স্বাভাবিকভাবেই নিই।”
ফেসিয়াল হারমোনাইজেশন কী? ফুটবলারদের করা সব ধরনের সৌন্দর্যবর্ধক চিকিৎসাকেই ফেসিয়াল হারমোনাইজেশন বলা যায় না। মূলত মুখের বলিরেখা বা অভিব্যক্তিজনিত রেখা কমানো এবং হায়ালুরোনিক অ্যাসিড ব্যবহার করে মুখের বিভিন্ন অংশের গঠন বা আকৃতি আরও ভারসাম্যপূর্ণ করার চিকিৎসাকেই ফেসিয়াল হারমোনাইজেশন বলা হয়। এ ছাড়া নিয়মিত পরিচর্যার অংশ হিসেবে অনেকেই বোটুলিনাম টক্সিন বা বোটক্সও ব্যবহার করেন। ডা. ভিভিয়ান সিমোয়েস পিরেস বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে ফেসিয়াল হারমোনাইজেশন শব্দটি খুব জনপ্রিয় হয়েছে। তবে আমরা চিকিৎসকেরা সাধারণত এ নামটি খুব বেশি ব্যবহার করি না। আমরা বলি, মুখের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর অবস্থান পুনর্গঠন বা ভারসাম্যপূর্ণ করা। এর জন্য হায়ালুরোনিক অ্যাসিড–ভিত্তিক ফিলার ব্যবহার করা হয়, যা মুখে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে সাহায্য করে। কখনো আমরা শুধু মুখের গঠন ঠিক করি, আবার কখনো নতুন আকৃতিও তৈরি করি। যেমন কারও থুতনি ছোট হলে সেটিকে আরও স্পষ্ট করে তুলি, আবার কারও মুখের কনট্যুর পরিষ্কার না থাকলে সেটিও গড়ে দিই। এসব কাজেই হায়ালুরোনিক অ্যাসিড ফিলার ব্যবহার করা হয়, যা ফেসিয়াল হারমোনাইজেশনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”
খরচ কত? ফেসিয়াল হারমোনাইজেশনের নির্দিষ্ট কোনো খরচ নেই। প্রতিটি রোগীর মুখের গঠন, ত্বকের অবস্থা এবং কী ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন—এসব বিবেচনা করে চিকিৎসক খরচ নির্ধারণ করেন। তবে একটি সেশনের খরচ ৬০ হাজার ব্রাজিলিয়ান রিয়াল বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৪.৫১ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। ডা. ভিভিয়ান সিমোয়েস পিরেস বলেন, “খরচ নির্ভর করে কোন ধরনের চিকিৎসা লাগবে, রোগীর ত্বকের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, লেজার বা অন্য প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে কি না—এসব বিষয়ের ওপর। প্রায় ১০টি সিরিঞ্জ বা ১০ মিলিলিটার ফিলার দিয়ে একটি মৌলিক ফেসিয়াল হারমোনাইজেশনের খরচ ৩০ হাজার ব্রাজিলিয়ান রিয়াল থেকে শুরু হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী তা ৫০ হাজার বা ৬০ হাজার ব্রাজিলিয়ান রিয়াল পর্যন্ত হতে পারে।”
খেলায় প্রভাব পড়ে? অনেকেরই প্রশ্ন, এ ধরনের সৌন্দর্যবর্ধক চিকিৎসা কি ফুটবলারের মাঠের পারফরম্যান্সে কোনো প্রভাব ফেলে? চিকিৎসকদের মতে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উত্তর হলো—না। অল্প সময়ের মধ্যেই খেলোয়াড়েরা স্বাভাবিকভাবে মাঠে ফিরতে পারেন। সমালোচনার ভয়, তবু থামছেন না ফুটবলাররা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ফুটবলারের চেহারার বড় পরিবর্তন নিয়ে মিম তৈরি হয়, বিদ্রূপও করা হয়। তবে শুধু এসব নয়, ফুটবল অঙ্গনের প্রচলিত মানসিকতাও অনেক খেলোয়াড়কে সৌন্দর্যবর্ধক চিকিৎসার বিষয়টি গোপন রাখতে বাধ্য করে। বেশির ভাগ ফুটবলার ছুটির সময় এসব চিকিৎসা করান, যাতে মাঠের পারফরম্যান্সের সঙ্গে চেহারার পরিবর্তনের কোনো যোগসূত্র টানা না হয়। অনেকে আবার গোপনীয়তা বজায় রাখতে পরিচয় আড়াল করে ক্লিনিকে যান। তবে বর্তমান সময়ে ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির গুরুত্ব বাড়লেও ব্র্যান্ডিং ও সুনাম ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ জুলিয়ানা ট্রানকুইলিনির মতে, একজন ফুটবলারের সবচেয়ে বড় পরিচয় ও উত্তরাধিকার এখনো নির্ধারিত হয় মাঠের পারফরম্যান্সেই, চেহারা দিয়ে নয়। তিনি বলেন, “একজন অ্যাথলেটের উত্তরাধিকার গড়ে ওঠে তাঁর চেহারায় নয়, বরং মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করার ক্ষমতা, নিজের গল্প নির্মাণ এবং খেলোয়াড়, পেশাজীবী ও মানুষ হিসেবে এমন একটি ছাপ রেখে যাওয়ার মাধ্যমে, যা দীর্ঘদিন মনে রাখা হবে।”




