একা সন্ধ্যা মানেই কি বিষণ্নতা? জেন-জি প্রজন্মের কাছে এই ধারণাটি এখন পুরোনো। বন্ধু বা সঙ্গী ছাড়া কাটানো সময়টুকু এখন হয়ে উঠছে আনন্দ ও আত্ম-আবিষ্কারের মাধ্যম। সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণ-তরুণীরা দেখাচ্ছেন, নিজের সঙ্গে সময় কাটানোও হতে পারে জীবনকে উপভোগ করার একটি সুন্দর উপায়।
ক্লান্তিকর অফিস শেষে বাসায় ফিরে একজন তরুণী ফ্রিজ থেকে ফ্রোজেন পিৎজা বের করেন, ওভেনে গরম করেন। জানালার পাশে একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে সোফায় শুয়ে টিভি দেখতে দেখতে একাই সেরে ফেলেন রাতের খাবার। কোনো পার্টি নেই, বন্ধুর ফোনকলও নেই—শুধু নিজের সঙ্গে একটি শান্ত সন্ধ্যা। প্রথম শুনতে এটি নিঃসঙ্গতার মতো মনে হলেও, এখন এই দৃশ্যই সোশ্যাল মিডিয়ার নতুন ট্রেন্ড। একাকী সময়কে লুকানোর বদলে সেটিকে কনটেন্টের মাধ্যমে সবার সামনে উপস্থাপন করছেন অনেকে।
টরন্টোর লানা ইসা এই ট্রেন্ডের অন্যতম জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর। পেশায় সফটওয়্যার সেলস ম্যানেজার হওয়া ইসার একটি টিকটক ভিডিও দেখেছেন প্রায় ৭০ লাখ মানুষ। ভিডিওটির ক্যাপশনে লেখা, ‘বন্ধু নেই, পরিবার নেই, একা থাকা এক মেয়ের শুক্রবার রাত এমনই কাটে’। ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক মিলিয়ে প্রায় চার লাখ মানুষ তাঁর স্কিনকেয়ার রুটিন, একা রাতে ফাস্ট ফুড কেনা বা লেকের পাশে বই পড়ার ভিডিও দেখেন।
স্কুল বদল, করোনাকালের নিঃসঙ্গতা এবং প্রথম প্রেমে বিচ্ছেদের পর নতুন শহরে পাড়ি জমানোর মাধ্যমে একা থাকতে শিখেছেন ইসা। তিনি বলেন, ‘বন্ধু নেই’ এই কথাটি বলতে এখনো মানুষ লজ্জা বোধ করে, যেন এটি একটি অপরাধ। কিন্তু তিনি যখন খোলাখুলি এই সত্য প্রকাশ করা শুরু করেন, মাত্র আট মাসে তাঁর ফলোয়ার সংখ্যা দুই হাজার থেকে বেড়ে প্রায় দুই লাখে পৌঁছে যায়।
জনপ্রিয়তার সঙ্গে সমালোচনাও জুড়েছে। কেউ কেউ ইসাকে ‘লোনলিনেস ইনফ্লুয়েন্সার’ বলে আখ্যায়িত করছেন। অভিযোগ, এই ক্রিয়েটররা একাকীত্বকেই সুন্দর কনটেন্টের মাধ্যমে বিক্রি করছেন। অ্যারিজোনার ডেভন নরিং অবশ্য এই সমালোচনায় বিরক্ত। তিনি নিজেও নিঃসঙ্গতা নিয়ে কনটেন্ট তৈরি করেন এবং নিজেকে অন্তর্মুখী বলে পরিচয় দেন। কুকুরের সঙ্গে বাসায় কাটানো নিরিবিলি উইকেন্ডকে নারীর একাকীত্বের প্রতীক বানানো তাঁর কাছে হাস্যকর মনে হয়। শৈশবে সোশ্যাল অ্যাংজাইটিতে ভোগা নরিং মনে করেন, একা থাকার সময়টাতেই তিনি সবচেয়ে বেশি মুক্ত এবং নিজের মতো থাকতে পারেন।
সিডনি ইউনিভার্সিটির গবেষক মেলোডি ডিং একাকীত্ব নিয়ে কাজ করেন। তাঁর মতে, জীবনের কোনো না কোনো সময় প্রায় সবাই একাকিত্বের মুখোমুখি হন, কিন্তু তা স্বীকার করতে লজ্জা পান। সব সময় হাসিখুশি থাকা এবং সবার সঙ্গে মিশতে পারার একটি সামাজিক চাপ সবার ওপর বর্তায়। তবে ডিং সতর্ক করে বলেন, ইনফ্লুয়েন্সাররা একা থাকাকে যতই সুন্দর দেখান, বাস্তবতা ভিন্ন। মানুষ সামাজিক জীব; দীর্ঘদিন একা থাকলে তা মানসিক ও শারীরিক উভয় দিক থেকেই ক্ষতিকর হতে পারে।
কানেকটিকাট ইউনিভার্সিটির অ্যান অয়েলডর্ফ-হার্শ অনলাইন কমিউনিটি নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর বিশ্লেষণ, সোশ্যাল মিডিয়ায় বছরের পর বছর ধরে চলা ‘পারফেক্ট লাইফ’ দেখানোর প্রতিযোগিতায় ক্লান্ত হয়ে মানুষ এখন এমন কনটেন্ট খুঁজছে, যার সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবন মিলে যায়। যুক্তরাজ্যের এসজে হোডলি সাত বছরের একটি খারাপ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে নতুন শহরে জীবন শুরু করেন, যেখানে তিনি কাউকে চিনতেন না। শুরুতে অস্বস্তি লাগলেও ধীরে ধীরে সেই স্বাধীনতাকে তিনি ভালোবেসে ফেলেন। নিজের সঙ্গকে আপন করে নেওয়াটাই তাঁর কাছে বড় পাওয়া।
এই ক্রিয়েটরদের কেউই বলছেন না যে তাঁরা চিরকাল একাই থাকতে চান। হোডলি নতুন বন্ধু পাওয়ার স্বপ্ন দেখেন, নরিং চান একদিন তাঁর ফলোয়ারদের সঙ্গে বাস্তবে দেখা করতে, আর ইসা জানান, এই কমিউনিটিই তাঁকে নতুন করে বন্ধু খোঁজার সাহস দিয়েছে। জেন-জির সলো লিভিং ট্রেন্ডটি আসলে একটি প্রশ্ন তুলেছে—একা থাকা মানেই কি মন খারাপ, নাকি নিজের সঙ্গে সময় কাটানোও একটি ভালো লাগার জীবন হতে পারে? উত্তর সবার জন্য একরকম নয়, তবে এটা স্পষ্ট যে, একলা ঘরের শান্ত সন্ধ্যাটি এখন আর লুকানোর বিষয় নয়, বরং নিজের মতো করে বাঁচার একটি নতুন পথ।




