শরীরের গন্ধ নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। কেউ কেউ মনে করেন, বয়স্কদের শরীর থেকে বিশেষ এক ধরনের গন্ধ বেরোয়, যা পুরোনো ঘর, জমানো কাপড় বা আলমারির গন্ধের মতো। আবার কারও কারও কাছে এটি স্যাঁতসেঁতে ভেজা ঘাসের গন্ধ মনে হতে পারে। প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি বয়স বাড়লে শরীরে আলাদা কোনো গন্ধ তৈরি হয়? যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ সোনাল চৌধুরী বলছেন, এই গন্ধের কিছু শারীরবৃত্তীয় কারণ থাকলেও গন্ধটি ত্বক থেকে নাকি পরিবেশ, স্মৃতি বা পুরোনো জিনিসের কারণে সৃষ্ট — তা আলাদা করে চেনা কঠিন।
বয়স বাড়লে ত্বকে প্রাকৃতিক কিছু রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে, যার কারণে পরিচ্ছন্ন থাকা মানুষদের শরীরেও গন্ধের পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। এই গন্ধের জন্য মূলত দায়ী একটি রাসায়নিক যৌগ, যার নাম ২-নোনেনাল। ত্বকে জমে থাকা তেল যখন বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে জারিত হয়, তখন এই যৌগটি তৈরি হয়। ২০০১ সালে জাপানি গবেষকেরা প্রথম দেখান, বয়স বাড়ার সঙ্গে ত্বকে ২-নোনেনালের পরিমাণ বেড়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, চল্লিশোর্ধ্ব বয়স থেকে এটি বাড়তে শুরু করে এবং একটি পর্যায়ে গিয়ে থেমে যায়। তবে শারীরিক গঠনভেদে এর মাত্রা ভিন্ন হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার মোনেল কেমিক্যাল সেন্সেস সেন্টারে চালানো এক গবেষণায় বিভিন্ন বয়সের মানুষের ঘামের গন্ধ পরীক্ষা করা হয়। দেখা যায়, মধ্যবয়সী পুরুষদের ঘামের গন্ধ সবচেয়ে কটু, তবে বয়স্কদের গন্ধ ততটা খারাপ নয়। এই গবেষণা থেকে বোঝা যায়, বয়স্কদের শরীরের গন্ধের পেছনে কেবল রাসায়নিক উপাদান দায়ী নয়; বরং জীবনযাত্রা, পরিচ্ছন্নতা ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশও ভূমিকা রাখে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরে নানা পরিবর্তন আসে, যা গন্ধকে প্রভাবিত করে। ওষুধ গ্রহণ, দীর্ঘমেয়াদি রোগ, শারীরিক সীমাবদ্ধতা, নিজের যত্ন নেওয়ার ধরন বা থাকার জায়গার পরিবর্তন—সবই গন্ধ বদলে দিতে পারে। বিশেষ করে বিষণ্নতা ও ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট ঘামের গন্ধে প্রভাব ফেলে। রসুন, পেঁয়াজ ও বেশি মসলাযুক্ত খাবার তো আছেই। এছাড়া পোশাকের ধরন, কাপড় ধোয়ার নিয়ম ও পরিচ্ছন্নতার অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, বয়স এখানে একটি ছোট্ট অংশ মাত্র।
মানুষের মন ও স্মৃতিও গন্ধ উপলব্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে। আমরা যা শুঁকব বলে মনে করি, মস্তিষ্ক অনেক সময় আমাদের ঠিক সেটাই অনুভব করায়। কোনো গন্ধের পেছনে অভিজ্ঞতা, সংস্কৃতি ও পরিচিত পরিবেশ কাজ করে। অনেক সময় নির্দিষ্ট গন্ধকে আমরা দাদা-দাদি, পুরোনো আসবাব, ন্যাপথলিন বা পুরোনো ঘরের স্মৃতি দিয়ে চিনি। ফলে পুরো বিষয়টিকে শুধু একটি রাসায়নিক দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। ২-নোনেনাল প্রথম আবিষ্কৃত হওয়ায় এটি নিয়ে আলোচনা বেশি, তবে আসল গন্ধ তৈরি হয় ত্বকের তেল, ঘাম, ব্যাকটেরিয়া, ওষুধ, খাবার, রোগ ও পরিবেশের সমন্বয়ে।
সোনাল চৌধুরী জানান, শরীরের গন্ধ ধীরে ধীরে বদলালে চিন্তার কারণ নেই। তবে হঠাৎ বড় ধরনের পরিবর্তন হলে, বিশেষ করে ওজন কমে যাওয়া, জ্বর, অতিরিক্ত ঘাম, প্রস্রাবে পরিবর্তন বা ত্বকের সমস্যা দেখা দিলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এটি শরীরে লুকিয়ে থাকা কোনো রোগ বা ওষুধের প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত হতে পারে।
গন্ধ কমানোর জন্য নিয়মিত শরীর পরিষ্কার রাখা, জামাকাপড় ধোয়া এবং ময়েশ্চারাইজার ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি। অ্যান্টি-অক্সিডেন্টযুক্ত খাবার, যেমন গাঢ় সবুজ শাক ও শিমজাতীয় খাবার ২-নোনেনাল তৈরি কমাতে সাহায্য করে। তবে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ক্রিম বা সিরাম ব্যবহারে এটি কমে কি না, তা এখনো গবেষণায় প্রমাণিত নয়। ২-নোনেনাল কমানোর কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা এখনো নেই, তবে সাধারণ সাবান, পানি ও সঠিক যত্নেই অনাকাঙ্ক্ষিত গন্ধ রোধ সম্ভব।




