‘শুরু করছি তার নামে যার কোনো নাম নেই’—এই উক্তির মাধ্যমে প্রায়শই স্মরণ করা হয় দারা শুকোহকে। ১৬৫৯ সালে আওরঙ্গজেবের হাতে নিহত হওয়া এই মোগল যুবরাজ ছিলেন সম্রাট শাহজাহানের জ্যেষ্ঠ পুত্র। উত্তরাধিকার যুদ্ধে পরাজয়ের পর মাত্র চুয়াল্লিশ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু ঘটে। রাজনৈতিক স্বপ্ন ভেঙে গেলেও তাঁর বৌদ্ধিক ও দার্শনিক উত্তরাধিকার আজও গভীরভাবে আলোচিত। তাঁর দরবার ছিল সুফি, সংস্কৃত, হিন্দু, খ্রিষ্টীয় ও ইউরোপীয় জ্ঞানের এক অনন্য মিলনস্থল। সেখানে তিনি একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন—মানুষ নানা নামে ডাকলেও সত্য কি এক?

শৈশব কাটে শাহজাহানের ভারতবর্ষে—তাজমহলের নির্মাণ, শাহজাহানাবাদের উত্থান ও পারস্যভাষী দরবারি সংস্কৃতির বিকাশের মধ্যে। আকবরের সময় থেকেই সংস্কৃত জ্ঞানকাণ্ড ফারসিতে অনুবাদের কাজ শুরু হয়েছিল। দারা গভীরভাবে কাদিরিয়া সুফি তরিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি এমন সত্যের সন্ধান করতেন, যা ধর্মীয় পরিচয়ের সীমানা অতিক্রম করতে পারে। এই অনুসন্ধান তাঁকে হিন্দু সাধক ও পণ্ডিতদের কাছেও নিয়ে যায়। বাবা লাল দাসের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাঁর লেখা ‘মজমাউল বাহরায়েন’ বা দুই সমুদ্রের মিলনে সুফিভাবনা ও ভারতীয় দর্শনের তুলনামূলক আলোচনা উঠে আসে। সেখানে তিনি দুই ধারাকে এক করতে চাননি; বরং তাদের পানির স্বাদে মিল আছে কিনা, সেটিই দেখতে চেয়েছিলেন।

মোগল দরবারে ইউরোপীয়দের উপস্থিতি তাঁর জন্মের আগেই শুরু। আকবর ও জাহাঙ্গীরের সময়ে জেসুইট পাদরিদের সঙ্গে ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক চলেছিল। শাহজাহানের আমলে সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলেও মিশনারিদের উপস্থিতি বন্ধ হয়নি। দারা নিজেও জেসুইটদের সঙ্গে ধর্ম ও দর্শন নিয়ে আলোচনা করতেন। ১৬৫৬ সালে ভারতে আসা ফরাসি চিকিৎসক ফ্রাঁসোয়া বারনিয়ে তাঁর দরবারে যুক্ত হন। বারনিয়ে ছিলেন পিয়েরে গ্যাসাদিঁর অনুসারী। ১৬৬০-এর দশকের গোড়ার দিকে তিনি মোগল আমির দানিশমন্দ খানের কাছে রেনে দেকার্তে ও গ্যাসাদিঁর দর্শন ফারসিতে ব্যাখ্যা করতেন। সেই আলোচনায় ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরাও উপস্থিত থাকতেন। দেকার্তের দর্শন তাঁর মৃত্যুর এক দশকের মধ্যেই বারানসির পণ্ডিতদের বৌদ্ধিক পরিসরে পৌঁছেছিল। এই সূত্রে দারার চিন্তাজগৎ ইউরোপীয় দর্শনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে।

দারার বৌদ্ধিক পরিসরে ছিলেন সরমদ কাশানিও—ইহুদি বংশোদ্ভূত ফারসিভাষী মরমি সাধক, যাঁর চিন্তায় ইহুদি ঐতিহ্য, ইসলামি সুফিবাদ ও ভারতীয় দর্শনের স্রোত মিলেছিল। তাঁর শিষ্য অভয় চাঁদ তাওরাতের ফারসি অনুবাদ করেন। এই ছিল মোগল ভারতের একটি অনন্য চেহারা, যা আজ অনেকটাই আড়ালে পড়ে আছে। দারা উপনিষদকে ঐশী গ্রন্থে উল্লিখিত ‘কিতাব মকনুন’ বা গুপ্ত গ্রন্থের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করতেন। ১৬৫৭ সালে তাঁর তত্ত্বাবধানে বারানসির পণ্ডিতদের সহযোগিতায় প্রায় পঞ্চাশটি উপনিষদ সংস্কৃত থেকে ফারসিতে অনূদিত হয়। গ্রন্থটির নাম ‘সিররে আকবর’ বা মহাগোপন রহস্য। ভারতীয় বুদ্ধিবৃত্তির ইতিহাসে এটি একটি বড় ঘটনা। তাঁর পদ্ধতি ছিল অন্য ধর্মকে দূর থেকে বিচার না করে তার গভীরে প্রবেশ করা। তিনি বলতেন না যে ‘তোমার সত্য ভুল’; বরং জিজ্ঞাসা করতেন, ‘তুমি তোমার ভাষায় যে সত্যের কথা বলছ, আমি কি আমার ভাষার ভেতর তার কোনো প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছি?’

১৬৫৭ সালে বাদশাহ শাহজাহান অসুস্থ হয়ে পড়লে চার ভাই—দারা, শুজা, মুরাদ ও আওরঙ্গজেবের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়। পিতার পছন্দের উত্তরসূরি দারা পরাজিত হন। ১৬৫৯ সালে তাঁকে হত্যা করা হয়। রাজনৈতিক স্বপ্ন শেষ হয়ে গেলেও ‘সিররে আকবর’ থেকে যায়। প্যারিসের বিবলিওথেক নাশিওনাল দো ফ্রাঁসে আজও তাঁর একটি পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে; ক্যাটালগে এর মালিক হিসেবে বারনিয়ের নাম উল্লেখ রয়েছে। ১৭৭৫ সালে আব্রাহাম হায়াসিন্থ আঁকেতিল-দ্যুপেরোঁ পাণ্ডুলিপিটি পেয়ে প্রথমে ফারসিতে, পরে লাতিনে অনুবাদ করেন। লাতিনে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয় ১৮০১-০২ সালে। পরবর্তীতে জার্মান ভাষায় অনূদিত হলে তা পশ্চিমের দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ারের হাতে পৌঁছায়। দারা নিহত হওয়ার প্রায় দেড় শতাব্দী পর ইউরোপের এক গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক তাঁর অনুবাদের মাধ্যমে ভারতীয় মরমি জগতের সঙ্গে পরিচিত হন।

দারা ‘কাদেরি’ নামে ফারসিতে কবিতা লিখতেন। তাঁর কাছে দর্শন ছিল জিজ্ঞাসার কাজ, অনুবাদ জ্ঞানের কাজ এবং কবিতা ছিল সত্যের অনুভূতির ভাষা। তিনি এমন এক পৃথিবীর কল্পনা করেছিলেন, যেখানে সত্যের কোনো একক ভাষা নেই; ফলে কেউ তার একক মালিকানা দাবি করতে পারে না। যদি মানুষ পরস্পরের ভাষা শিখতে রাজি হয়, তবে দুই সমুদ্রের মধ্যেও সেতু গড়ে উঠতে পারে। তাঁর জীবন ছিল সেই সেতুর অসমাপ্ত নির্মাণ। তাঁর চারপাশে ছিলেন জেসুইটরা, বারনিয়ে, সরমদ, সংস্কৃত পণ্ডিতরা এবং সুফি-সাধক মিয়াঁ মীর। ইউরোপের নতুন দর্শনের খবরও আসছিল। এই সবকিছুকে ঘিরেই ছিল তাঁর স্বপ্ন—যা সপ্তদশ শতাব্দীর উপমহাদেশকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়। তাঁর কাজের মধ্যে স্পষ্ট একটি সম্ভাবনা—ফারসি, আরবি, সংস্কৃত ও ইউরোপীয় জ্ঞান পরস্পরের শত্রু নয়, বরং কথোপকথনের অংশীদার। অনুবাদ সেখানে শুধু ভাষা বদলায় না, পাঠকের বাস্তব জগৎকেও বদলে দেয়। দারা শুকোহ দুই সমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভারতীয় দার্শনিক-রাজপুত্র; তাঁর সেতুটি এখনও সম্পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষায়।