চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার সবুজচরে এখন আমন ধান চাষের ধুম। আষাঢ়ের শেষ সময়ে উপকূলীয় এই চরজুড়ে কৃষকদের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। উত্তর-পশ্চিম উপকূলে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৩ কিলোমিটার চওড়া সবুজচর ও ডোবাচর মিলিয়ে এবার প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে আমনের চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় চার হাজার হেক্টরে ছিটানো হয়েছে স্থানীয় রাজাশাইল ও লেম্বু ধানের বীজ। বাকি এক হাজার হেক্টরে স্বর্ণ ইরি, বাংলা শাইল, কাজল শাইলসহ অন্যান্য জাতের আবাদ করা হচ্ছে।

এ এলাকার অধিকাংশ কৃষক ‘বাইন’ নামে পরিচিত একটি পদ্ধতিতে ধান চাষ করেন। এ পদ্ধতিতে প্রথমে ধানের বীজ অঙ্কুরিত করা হয়। তিন দিন ধরে কয়েক দফা পানিতে ভিজিয়ে ও শুকিয়ে বীজের মুখে সাদা শিকড় বের করা হয়। এরপর জমিতে পানি জমিয়ে চাষ দিয়ে নরম কাদা তৈরি করে সেই অঙ্কুরিত বীজ হাতের মুঠোয় নিয়ে ছিটিয়ে দেওয়া হয়। বীজতলা তৈরির প্রয়োজন না থাকায় এতে সময় ও শ্রম দুটোই কম লাগে। খরচও অনেক কম হয়।

শনিবার সকালে সবুজচরের থাক দীর্ঘাপাড় মৌজায় দেখা যায়, শেষ চাষের কাজ শেষ করে কৃষকরা বালতি ও বস্তায় ভরা অঙ্কুরিত বীজ জমিতে ছিটিয়ে দিচ্ছেন। সাদ্দাম হোসেন (৩২) নামের এক কৃষক জানান, গোছা বুনে ধান চাষ করতে হলে বিশাল এলাকায় প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন হতো, যা পাওয়া দুরূহ। খরচও বেড়ে যেত। তাই তারা বাইন পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন।

সন্দ্বীপের পূর্ব উপকূলের অভ্যন্তরীণ চরাঞ্চলে আগে রোপা আমনের চাষ হলেও এখন সেখানেও বাইন পদ্ধতি জনপ্রিয় হচ্ছে। অনেক কৃষক গবাদিপশুর খাদ্যের জন্যও এভাবে ধান বুনছেন। চর সন্তোষপুরের তছলিম উদ্দিন (৫০) জানান, বর্ষায় গরু-মহিষ চরানোর জায়গা সংকট হয়। কম খরচে বাইন ছিটিয়ে খড় ও ধান উভয়ই পাওয়া যাচ্ছে।

তবে এই পদ্ধতিতে কিছু ঝুঁকিও আছে। শনিবার সকাল থেকে শেষ বিকেল পর্যন্ত প্রখর রোদ ছিল। এ রকম টানা কয়েক দিন রোদ থাকলে জমিতে ছিটানো বীজ শুকিয়ে যেতে পারে। মাইন উদ্দিন (৪০) নামের এক কৃষক উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মারুফ ইসলাম জানান, খরার মতো প্রতিকূলতা না থাকলে বাইন পদ্ধতি ভালো ফল দেয়। তিনি আরও জানান, সন্দ্বীপের আউশ ধানের চাষিরা জমিতে ছোট গর্ত করে শুকনা ধান মাটিচাপা দেন, যা অঙ্কুরিত হয়। সন্দ্বীপের বাইরে আর কোথাও এ পদ্ধতি দেখা যায় না। কৃষি কর্মকর্তা আরও উল্লেখ করেন, সবুজচর এখন দেশের বৃহত্তম একক আমনভান্ডার। তবে উচ্চ ফলনশীল জাতের স্বাদুপানির আমনের চাষ এখানে হয় না বলে উৎপাদন তুলনামূলক কম।

চাষিদের প্রত্যাশা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড় বা উচ্চ জোয়ারের ধাক্কা না এলে কার্তিক মাসে তাঁদের ঘর সোনালি ধানে ভরে উঠবে। সবুজচর বর্তমানে ধান, মাছ ও পশুপালনে উপকূলীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত।