যুক্তরাজ্যের লন্ডনের লাখো মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডনের (টিএফএল) ডিজিটাল ব্যবস্থা এক নজিরবিহীন সাইবার হামলায় কয়েক দিনের জন্য স্থবির হয়ে পড়েছিল। ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই হামলা চলে, যাতে বন্ধ হয়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন সেবা ও যাত্রীসেবা। ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ পাউন্ড। প্রায় দুই বছর তদন্তের পর গতকাল বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) উলউইচ ক্রাউন কোর্টে এই মামলার রায় দেন বিচারক মার্ক টার্নার। রায়ে তিনি বলেন, এটি রাষ্ট্র-সমর্থিত কোনো অন্তর্ঘাত নয়, বরং আন্তর্জাতিক হ্যাকার গোষ্ঠী ‘স্ক্যাটার্ড স্পাইডার’ নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য এই বেপরোয়া হামলা চালিয়েছিল। আসামিরা লাখো মানুষের দুর্ভোগকে তোয়াক্কা করেনি বলে মন্তব্য করেন বিচারক।
কম্পিউটার মিসইউজ আইনের ৩ জেডএ ধারায় গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোয় হামলার সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলেও আসামিদের বয়স, নিউরোডাইভারজেন্ট অবস্থা এবং বিশেষ করে জুবায়েরের অটিজম ও ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের কথা বিবেচনা করে আদালত সাড়ে পাঁচ বছরের সাজা দেন। উভয় আসামি দোষ স্বীকার করায় সাজায় ছাড় পান।
হামলার সময় হ্যাকাররা পুরো সিস্টেমের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে আরও বড় বিপর্যয় এড়াতে টিএফএল পুরো নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করতে বাধ্য হয়। এর ফলে প্রায় ২৮ হাজার কর্মীকে অফিসে গিয়ে নতুন করে পাসওয়ার্ড ও নিরাপত্তা পরিচয়পত্র ‘রিসেট’ করতে হয়। তদন্তে জানা যায়, হামলার সময় ওয়েন ফ্লাওয়ার্স পুরো হ্যাকিং কার্যক্রমের ভিডিও ধারণ করে এবং জুবায়ের তা তাঁর বন্ধুদের টেলিগ্রাম গ্রুপে ছড়িয়ে দেয়। লন্ডনের পরিবহনব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তিনি দম্ভোক্তি করেন।
পূর্ব লন্ডনের বো এলাকায় একটি সাধারণ ফ্ল্যাটে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতেন জুবায়ের। তাঁর বাবা কেয়ারকর্মী এবং মা তাঁর দেখাশোনার জন্য চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিশোর বয়স থেকেই তাঁর অনলাইন প্রতারণা ও কম্পিউটার-সংশ্লিষ্ট অপরাধের রেকর্ড ছিল। ডার্ক ওয়েবে ছদ্মনামে তিনি আন্তর্জাতিক হ্যাকার মহলে পরিচিত ছিলেন। অন্যদিকে ফ্লাওয়ার্স ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের ওয়ালসালে নানি ও মামার সঙ্গে থাকতেন এবং আগেই পুলিশের নজরদারিতে ছিলেন। গ্রেপ্তারের সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বড় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছিলেন।
তদন্তকারীরা জানান, জুবায়েরের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেট ব্যবহার করে গিফট কার্ড ও অনলাইন গেমিং অ্যাকাউন্টে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছিল। এসব লেনদেন বিশ্লেষণ করে তাঁর অনলাইন পরিচয়, সার্ভার অবকাঠামো ও পূর্ব লন্ডনের বাসার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়। পুলিশ তাঁর বাসা থেকে একটি বাংলাদেশি পাসপোর্টও উদ্ধার করে, যা আগে কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়নি।
যুক্তরাজ্যে সাজার পর জুবায়েরের সামনে আরও বড় আইনি লড়াই অপেক্ষা করছে যুক্তরাষ্ট্রে। মার্কিন বিচার বিভাগ তাঁর বিরুদ্ধে পৃথক ফৌজদারি অভিযোগ এনেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৪৭টি প্রতিষ্ঠানে ১২০টির বেশি সাইবার হামলা চালিয়ে তাঁর চক্র ১১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ আদায় করেছে এবং বিভিন্ন ডিজিটাল ওয়ালেটের মাধ্যমে ২০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। যুক্তরাজ্যের সাজার মেয়াদ শেষ হলে তাঁর প্রত্যর্পণের বিষয়টি সামনে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলাটি আধুনিক রাষ্ট্রের ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা এবং ডিজিটাল জগতে অপরাধীদের ধরতে প্রযুক্তিই সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।

