সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি একটি উপবৃত্তির তালিকা ভাইরাল হয়েছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে মাগুরা-২ নির্বাচনী এলাকায় সরকারি বৃত্তির আওতাভুক্ত সকলেই হিন্দু সম্প্রদায়ের এবং কোনো মুসলিম শিক্ষার্থীকে এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এই দাবি ঘিরে ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগ তোলে শতাধিক ফেসবুক পেজ, গ্রুপ ও ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে একাধিক পোস্ট, ফটোকার্ড ও মন্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দাবি করা হচ্ছে যে শুধু হিন্দুরাই বৃত্তি পেয়েছে, আবার কোথাও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সঙ্গে বিষয়টি জড়িয়ে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়া হয়েছে। তবে ফ্যাক্ট-চেক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ভাইরাল তালিকাটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য নয়; বরং এটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)’ কর্মসূচির আওতায় সমতলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীভুক্ত শিক্ষার্থীদের জন্য প্রস্তুত উপবৃত্তির তালিকা।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য ফটোকার্ড ছড়িয়েছে ‘আজাদির ডাক’ নামের একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল। প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার অনুসারীর পেজটি থেকে ১০ জুলাই একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করে দাবি করা হয়, ‘মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য তাঁর নির্বাচনী এলাকার ৩২ জন শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তির টাকা প্রদান করেছেন, যাদের সবাই হিন্দু সম্প্রদায়ের। একজন মুসলিম শিক্ষার্থীকেও এই সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।’ ফটোকার্ডের শিরোনাম ছিল—‘বিএনপির “অসাম্প্রদায়িক” বাংলাদেশের নমুনা, উপবৃত্তি বিতরণে চরম বৈষম্য: ৩২ শিক্ষার্থীর সবাই হিন্দু, বঞ্চিত মুসলিমরা।’ একই দিনে প্রায় ৪ লাখ ৩১ হাজার অনুসারী থাকা ‘DU Insiders’ নামের আরেকটি ফেসবুক পেজও তাদের লোগো দিয়ে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করে, যেখানে দাবি করা হয় মাগুরা-২ আসনে ৩৫ জন বৃত্তিপ্রাপকের তালিকায় কোনো মুসলিম শিক্ষার্থী নেই। পরবর্তীকালে এই দুই ফটোকার্ডের স্ক্রিনশট ও একই ধরনের বক্তব্য বহু ফেসবুক পেজ, গ্রুপ ও ব্যক্তিগত প্রোফাইলে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক পোস্টে সরকার ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বৃত্তি দিয়েছে বা সংশ্লিষ্ট আসনের মন্ত্রী হিন্দু হওয়ায় এমনটি ঘটেছে বলে অভিযোগ তোলা হয়।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভাইরাল তালিকাটি মূলত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)’ কর্মসূচির আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সমতলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি নির্বাচনের তালিকা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক সায়মা আক্তারের স্বাক্ষরিত ১ এপ্রিলের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত দেশের অন্যান্য এলাকায় বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীভুক্ত জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য এই কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র ও অসহায় পরিবার এবং শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষা বৃত্তি, বসতঘর, বাইসাইকেল ও সেলাই মেশিনসহ বিভিন্ন সহায়তা প্রদান করা হয়। এই কর্মসূচি ১৯৯৬ সালে চালু হয় এবং প্রতি অর্থবছরে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সুবিধাভোগী নির্ধারণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়ন, আবেদন, সাক্ষাতকার ও যাচাই-বাছাই শেষে তালিকা অনুমোদন করা হয়। শুধু মাগুরা নয়, সারা দেশেই এই কর্মসূচির আওতায় নিয়মিত সহায়তা দেওয়ার খবর পাওয়া যায়।

অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন তালিকায় ‘বিশ্বাস’, ‘রায়’ প্রভৃতি পদবি থাকায় কীভাবে তারা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, মাগুরার শালিখা উপজেলায় ‘বাগদী’ স্বীকৃত ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। ২০২২ সালের জুনে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে শালিখায় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সভার খবর প্রকাশিত হয়, যেখানে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারিতে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। তালখড়ি ইউনিয়নের আদিবাসী বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি মঙ্গল রায় প্রথম আলোকে বলেন, শালিখার উপবৃত্তির তালিকায় থাকা ‘রায়’ ও ‘বিশ্বাস’ পদবিধারীরা বাগদি সম্প্রদায়ের। তাদের এলাকায় ছোটবেলা থেকে তাদের পাড়াকে ‘বাগদি পাড়া’ বলা হতো এবং রায় ও বিশ্বাস তাদের দীর্ঘদিনের বংশগত পদবি। তিনি জানান, তালিকায় যারা আছে তারা সবাই বাগদি সম্প্রদায়ের এবং সরকারি স্বীকৃত ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী হিসেবে এই সুবিধা পাচ্ছে। বাগদি সম্প্রদায় সরকারি তালিকায় থাকা ৫০টি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী গবেষক মেসবাহ কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ভারতে বাগদি সম্প্রদায় শিডিউল কাস্ট হিসেবে স্বীকৃত হলেও বাংলাদেশে সেই ধরনের কোনো শ্রেণিবিন্যাস নেই। তবে বাংলাদেশ সরকার সরকারি গেজেটের মাধ্যমে ৫০টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দিয়েছে, যার তালিকায় বাগদি সম্প্রদায়ও রয়েছে। তিনি বলেন, বাগদিরা বাংলাদেশের প্রাচীন আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর একটি। অতীতে এ সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ, লাঠিয়ালসহ বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘদিন তারা সামাজিক বৈষম্য, অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। সমাজে নিজেদের প্রতি প্রচলিত নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়াসে সময়ের সঙ্গে তারা ‘রায়’, ‘বিশ্বাস’সহ বিভিন্ন পদবি ব্যবহার শুরু করেন। ধর্মীয় পরিচয় প্রসঙ্গে অধ্যাপক মেসবাহ কামাল বলেন, বাগদি সম্প্রদায়ের অধিকাংশ সদস্য সনাতন (হিন্দু) ধর্মের অনুসারী। তারা প্রকৃতি পূজার ঐতিহ্য ধারণ করেন এবং হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করেন। ফলে তাদের ধর্মীয় পরিচয় সনাতন হলেও জাতিগত পরিচয়ের দিক থেকে তারা সরকার স্বীকৃত ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীভুক্ত সম্প্রদায়ের সদস্য। তাই নামের শেষে ‘রায়’ বা ‘বিশ্বাস’ পদবি থাকলেই কেবল বাঙালি হিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করা বা জাতিগোষ্ঠীগত পরিচয় অস্বীকার করা সঠিক নয়।

তালিকায় থাকা শতখালী সিংহেশ্বরপাড়া ও তালখড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দুটির প্রধান শিক্ষক মিঠু রানী ব্যানার্জী ও কল্পনা বিশ্বাস প্রথম আলোকে জানান, প্রতিবছর উপজেলা প্রশাসন থেকে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের তালিকা ও বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত থাকার প্রত্যয়নপত্র চাওয়া হয়। এবার যাদের নাম এসেছে, তারা বাগদি সম্প্রদায়ের এবং আগেও তারা এই প্রকল্পের আওতায় বৃত্তি পেয়েছিল।

এ বিষয়ে মাগুরার শালিখার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানভীর হাসান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবছর বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং এই শিক্ষার্থীরা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জনসংখ্যার তথ্যের ভিত্তিতে (আদমশুমারি অনুযায়ী শালিকা উপজেলায় ৩৪৩০ জন) ১ম-৫ম শ্রেণিতে ৩২ জন, ৬ষ্ঠ-১০ম শ্রেণিতে ২৫ জন এবং একাদশ–দ্বাদশ শ্রেণিতে ৭ জনসহ মোট ৬৪ জনকে শিক্ষাবৃত্তির জন্য নির্বাচিত করা হয়। তিনি জানান, শালিখা উপজেলায় শুধু বাগদী জাতিগোষ্ঠীর মানুষ থাকায় তাদেরই সুবিধাভোগী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে এবং এর আগেও এই জাতিগোষ্ঠীর ব্যক্তিরাই সহায়তা পেয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, এখানে ধর্মীয় বিবেচনায় কাউকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বা বাদ দেওয়া হয়নি এবং এটা উপজেলা প্রশাসনের নিয়মিত কাজের অংশ, যার সঙ্গে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রীর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

মাগুরার জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী তালিকা তৈরি করা হয়। যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর জাতিগোষ্ঠীগত পরিচয় নিশ্চিত করতে ওই সম্প্রদায়ের নেতাদের প্রত্যয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়ন এবং প্রতি উপজেলায় একটি নির্দিষ্ট কমিটি এগুলো যাচাই করে থাকে। তিনি বলেন, ‘শালিখায় যে তালিকা ছড়ানো হয়েছে, সেটা তৈরিতে কোনো অনিয়ম নেই। এখানে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর তালিকায় অন্য সম্প্রদায়ের লোকজনের থাকার সুযোগ নেই। এটি যারা ছড়িয়েছে, তাদের রাজনৈতিক বা ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে।’

আবেদনকারীদের যাচাই প্রক্রিয়া সম্পর্কে শালিখার ইউএনও তানভীর হাসান বলেন, উপবৃত্তির ক্ষেত্রে আবেদনকারী শিক্ষার্থীর সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অধ্যয়নরত থাকার প্রত্যয়নপত্র যাচাই করা হয়। অন্যদিকে সেলাই মেশিন, সাইকেল বা ঘর নির্মাণের মতো অন্যান্য সহায়তার ক্ষেত্রে তিনি নিজে সরেজমিনে গিয়ে সংশ্লিষ্ট পরিবার পরিদর্শন করেন এবং তাদের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করেন। পাশাপাশি বাগদি সম্প্রদায়ের স্থানীয় কমিটির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে আবেদনকারীদের পরিচয় ও তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়।

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ উন্নয়ন সহায়তা কর্মসূচির পাশাপাশি বাংলাদেশের মূলধারার জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন প্রান্তিক, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্যও সরকারের বিস্তৃত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি রয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মাধ্যমে ৯৭টি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে, যার আওতায় বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, দরিদ্র পরিবার, শিক্ষার্থী, মুক্তিযোদ্ধা, দলিত, বেদে, হিজড়া, চা-শ্রমিকসহ বিভিন্ন লক্ষ্যভিত্তিক জনগোষ্ঠী সহায়তা পেয়ে থাকে।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত উপবৃত্তির তালিকাটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের নয়; বরং সমতলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীভুক্ত শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘদিনের সরকারি কর্মসূচির অংশ। তাই ‘শুধু হিন্দুরাই বৃত্তি পেয়েছে’, ‘মুসলিমদের বঞ্চিত করা হয়েছে’ কিংবা ‘ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তালিকা তৈরি করা হয়েছে’—এ ধরনের দাবি তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট গোপন করে প্রচার করা হয়েছে, যার ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।