রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে শনিবার অনুষ্ঠিত ‘আহমদ ছফা স্মৃতিবক্তৃতা ২০২৬’-এ বক্তব্য রাখেন খ্যাতিমান লেখক ও অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। ‘আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা’ এবং ‘এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা’ যৌথভাবে এই আয়োজন করে। তিনি বক্তৃতায় আহমদ ছফার প্রতি রাজনৈতিক বৈষম্য ও সাহিত্যিকের মর্যাদা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। সলিমুল্লাহ খান বলেন, আহমদ ছফার মৃত্যুর পর তাকে বনানীর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা সম্ভব হয়নি। তৎকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকলেও সিটি করপোরেশনের দায়িত্বে থাকা সদ্য সাবেক আওয়ামী লীগ আমলের ব্যক্তিরা রাজনৈতিক কারণে এই সিদ্ধান্তে বাধা দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত তুরাগ নদের তীরে জায়গা কিনে কবর দিতে হয়—এই প্রক্রিয়ায় ঘুষ দিতে হয়েছে বলেও জানান এই বক্তা। তাঁর ভাষ্যমতে, যিনি সারা জীবন ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন, সেই আহমদ ছফার সমাধির জন্য ঘুষ দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত লজ্জাজনক।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্রশাসক আহমদ ছফার কবর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেন। তবে সেই কাজ এখনও সম্পন্ন হয়নি। দুই বছর ধরে এ নিয়ে লড়াই চলছে বলে উল্লেখ করেন সলিমুল্লাহ খান। তিনি বলেন, এজন্য গণপূর্ত ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি প্রয়োজন, যা এখনও পাওয়া যায়নি।

অনুষ্ঠানের মূল বক্তা ছিলেন আহমদ ছফার ভাতিজা ও রচনাবলির সম্পাদক নূরুল আনোয়ার। তিনি মহিউদ্দিন আহমদ রচিত ‘আমার কথা কইবে পাখি’ বইটির কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, বইটিতে আহমদ ছফাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন ও তাচ্ছিল্য করা হয়েছে এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য স্থান পেয়েছে। নিজেও এই বইয়ের জবাবে একটি উপন্যাস লিখেছেন বলে জানান নূরুল আনোয়ার। সলিমুল্লাহ খানও ওই বইয়ের সমালোচনা করে বলেন, মহিউদ্দিন আহমদ নিজেই এক ফোনালাপে স্বীকার করেছেন যে তিনি আহমদ ছফার কবরের অবস্থান জানতেন না। অথচ তাঁর উপর একটি বই লিখে ফেলেছেন—এতে লেখকের কৃত্রিমতার প্রমাণ মেলে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সলিমুল্লাহ খান ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করে জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় তৎকালীন কংগ্রেস নেতা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে আহমদ ছফার বিতর্ক হতো। তিনি দ্বিজাতি তত্ত্ব নিয়ে স্বতন্ত্র অবস্থান নিয়েছিলেন। আহমদ ছফা মনে করতেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের খণ্ডন নয়, বরং এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা। সলিমুল্লাহ খান আরও বলেন, আহমদ ছফার কথাসাহিত্য ও কাব্যপ্রতিভা তুলনাহীন। শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের যুগে জন্মগ্রহণ করায় তাঁর কাব্য প্রতিভা কিছুটা আড়ালে থেকে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অনুষ্ঠানের শেষভাগে বাংলা ভাষার বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন সলিমুল্লাহ খান। তাঁর মতে, উচ্চশ্রেণির মানুষের উদ্যোগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বাংলা ভাষা ক্রমশ সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলার পরিবর্তে ইংরেজির প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় দেশের ভেতরে এক ধরনের সাংস্কৃতিক শূন্যতা তৈরি হবে বলে আশঙ্কা তার। ঢাকার বড়লোকদের বাসায় ইংরেজিতে নাম ও নম্বর ব্যবহারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, একে তারা ‘গ্লোবালাইজেশন’ বললেও এটি মূলত নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। আহমদ ছফা এই প্রবণতার বিরুদ্ধে пожизненной লড়াই করেছেন বলেও স্মরণ করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন দৈনিক যুগান্তরের সহকারী সম্পাদক মাহবুব কামাল, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি মোহন রায়হান এবং আহমদ ছফার বন্ধু ও ব্যবসায়ী নেতা আবদুল হক।