ঢাকার বাংলামোটরে অবস্থিত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে শনিবার অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে কথাসাহিত্যিক রোমেনা আফাজকে গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে আনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ইসলামী পাঠাগার ও সমাজকল্যাণ পরিষদ এই আয়োজনের আয়োজন করে, যাতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির সভাপতি আনিছুল হক এবং সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আহাদুল ইসলাম।

প্রাবন্ধিক ও গবেষক মোহাম্মদ আজম তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, বিশ্বসাহিত্যের জনপ্রিয় কাল্পনিক চরিত্র শার্লক হোমসকে ঘিরে বিশ্বব্যাপী গবেষণা চললেও রোমেনা আফাজের কাজ নিয়ে তেমন উদ্যোগ নেই। তিনি স্বীকার করেন যে রোমেনা আফাজের ভাষা ও গঠনগত কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও তাঁর জনপ্রিয়তা ও পাঠাভ্যাস গঠনে অসামান্য ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই প্রাসঙ্গিকতার নিরিখে তাঁর সাহিত্যকে গবেষণার আওতায় আনা জরুরি বলে মত দেন তিনি। বর্তমানে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মোহাম্মদ আজম আরও বলেন, ষাট, সত্তর ও আশির দশকে রোমেনা আফাজ যে পাঠাভ্যাস গড়ে তুলেছিলেন তার ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রাখা যায়নি। তবে তাঁকে এবং তাঁর সৃষ্টিকর্মকে গবেষণার মাধ্যমে পুনরুদ্ধারের সুযোগ এখনও বিদ্যমান। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রোমেনা আফাজের নির্বাচিত সংকলন প্রকাশের তাগিদ দেন।

সেমিনারে অসুস্থতার কারণে উপস্থিত থাকতে পারেননি প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক আকিমুন রহমান। তাঁর ‘জন্ম শতবর্ষে, রোমেনা আফাজকে, এমত প্রণতি’ শীর্ষক প্রবন্ধটি পড়ে শোনান মোস্তফা মুশফিক। অন্যদিকে লেখক মফিদুল হকের ‘রোমেনা আফাজ: উপেক্ষার একশত বছর’ প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন আশরাফুল আলম। সেমিনারের একটি অংশে রেবেকা সুলতানা রোমেনা আফাজের দস্যু বনহুর সিরিজ থেকে পাঠ করেন। এ ছাড়া লেখিকার জীবনীভিত্তিক একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে কথাসাহিত্যিক তানজিনা হোসেন বলেন, ১৯৬০ থেকে ১৯৮০-এর দশকের পাঠকদের মধ্যে রোমেনা আফাজের বই পড়েননি এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন। তিনি বাংলাদেশের মানুষের বইমুখী হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও মূলধারার স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছেন। গোয়েন্দা গল্প ও রহস্য কাহিনির এই রচয়িতা জানতেন যে তাঁর কাজ মূলধারায় স্থান পাবে না, তবু তিনি লিখে গেছেন বলে মন্তব্য করেন তানজিনা হোসেন।

জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন রোমেনা আফাজের পুত্র মন্তেজুর রহমান, যিনি বর্তমানে বগুড়ায় বসবাস করছেন। তিনি তাঁর মায়ের একটি কবিতার অংশ পড়ে শোনান এবং আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, মা জীবিত থাকার সময় কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পাননি। ২০০৩ সালে মৃত্যুর পর ২০১০ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। মন্তেজুর রহমান বলেন, মা যদি এই পদক দেখে যেতে পারতেন, তবে তিনি অনেক খুশি হতেন। তাঁর ভাষ্যমতে, স্বাধীনতা পুরস্কার ছাড়াও রোমেনা আফাজ ২৭টি পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন এবং ৩৫টি সমাজসেবামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

রোমেনা আফাজের পুরো নাম রোমেনা খাতুন খুকী, তবে বিয়ের পর তিনি রোমেনা আফাজ নামে পরিচিত হন। ১৯২৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর বগুড়ার শেরপুরে তাঁর জন্ম। পিতা কাজেম উদ্দীন আহম্মদ পুলিশ পরিদর্শক (দারোগা) ছিলেন। মাত্র নয় বছর বয়সে কলকাতার ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকায় ‘বাংলার চাষী’ ছড়াটি প্রকাশের মাধ্যমে তাঁর লেখালেখির সূচনা। তেরো বছর বয়সে বগুড়ার ফুলকোট গ্রামের চিকিৎসক মো. আফাজ উল্লাহ সরকারের সঙ্গে বিবাহ হয় এবং সাত পুত্র ও দুই কন্যার জননী হন তিনি। ১৯৫৯ সালে তাঁর প্রথম বই ‘রক্তে আঁকা ম্যাপ’ প্রকাশিত হয়। ১৯৬৫ সালে দস্যু বনহুর সিরিজের প্রথম খণ্ড বের হয়; ১৯৮৫ সালে ১৩৮তম খণ্ড প্রকাশের পর তিনি লেখালেখি থেকে অবসর নেন। তাঁর মোট ২৫০টি বই প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে ১৩৮টি দস্যু বনহুর সিরিজ, ১২টি দস্যুরাণী সিরিজ, এবং বাকি উপন্যাস, ছোটগল্প ও কাব্যগ্রন্থ। তাঁর ছয়টি বই ‘কাগজের নৌকা’, ‘মোমের আলো’, ‘মায়ার সংসার’, ‘মধুমিতা’, ‘মাটির মানুষ’ ও ‘দস্যু বনহুর’ থেকে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ২০০৩ সালের ১২ জুন ৭৭ বছর বয়সে তিনি মারা যান।

সেমিনারে মন্তেজুর রহমান আরও জানান, বগুড়ায় রোমেনা আফাজ স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে পরিচালিত ‘রোমেনা আফাজ স্মৃতিঘর’-এ তাঁর পাণ্ডুলিপি, প্রকাশিত বই, ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী, আলোকচিত্র ও ভক্তদের চিঠি সংরক্ষিত রয়েছে, যা সবার জন্য উন্মুক্ত।