দেশের সর্ব-উত্তরের চা-বাগান পঞ্চগড়ের কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটে আর্থিক লেনদেনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চা-শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করা হতো নগদ টাকায়, যার জন্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। সেই সাথে অর্থ বহনের ঝুঁকিও ছিল। তবে এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। এই এস্টেটের প্রায় ৬০০ শ্রমিক তাদের বেতন পাচ্ছেন বিকাশের ডিজিটাল ওয়ালেটে, যা দেশের কোনো চা-বাগানে প্রথম। নির্ধারিত সময়ে বেতন সরাসরি মোবাইল ওয়ালেটে পৌঁছে যাওয়ায় শ্রমিকদের আর অফিসে গিয়ে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে টাকা তোলার প্রয়োজন পড়ছে না।

এই নতুন ব্যবস্থায় খুশি শ্রমিকেরাও। এস্টেটের চা-শ্রমিক মাজেদুর রহমান জানান, আগে বেতন পেতে অনেক ঝক্কি পোহাতে হতো। এখন টাকা সরাসরি মোবাইলে চলে আসায় প্রয়োজন অনুযায়ী খরচ করা যাচ্ছে এবং বাকি টাকা সঞ্চয়ও করা যাচ্ছে। তার মতে, এই সুবিধা আরও আগে চালু হলে ভালো হতো। আরেক শ্রমিক বানু আক্তার বলেন, আগে বেতন তুলতে অফিসে গিয়ে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। এখন যখন খুশি মোবাইল থেকেই টাকা তোলা যায়, যা তাদের জন্য অনেক বেশি সুবিধাজনক।

বেতন পরিশোধের এই ডিজিটাল পদ্ধতি শুধু শ্রমিকদেরই নয়, বাগান কর্তৃপক্ষেরও কাজ সহজ করেছে। এস্টেটের ৯টি ডিভিশনে আলাদাভাবে ক্যাশ টাকা পাঠিয়ে বেতন বিতরণের ঝামেলা এখন আর নেই। পঞ্চগড় শহর থেকে ক্যাশ এনে বিতরণের সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়াটিও বাদ পড়েছে। এক ক্লিকেই একই সময়ে সব শ্রমিকের কাছে বেতনের টাকা পৌঁছে যাচ্ছে। এস্টেটের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগের ম্যানেজার মুন্সি মো. আল ইমরান হোসেন জানান, নিরাপত্তার বিষয়টি তাদের কাছে প্রথম অগ্রাধিকার ছিল। আগে যে শঙ্কা ছিল, তা এখন কেটে গেছে। এছাড়া শত শত শ্রমিককে হাতে হাতে টাকা দিতে আগে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগত, এখন সেই সময় বেঁচে যাচ্ছে।

এস্টেটের অপারেশনস ম্যানেজার প্রদীপ কুমার ভার্মা জানান, ৪৪৫ হেক্টর এলাকাজুড়ে ৯টি ডিভিশনে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে প্রায় ৬০০ জন শ্রমিক কাজ করেন। এক দিনে সবার বেতন পরিশোধ করা আগে ছিল কষ্টসাধ্য এবং এর জন্য আলাদা লোকবলও প্রয়োজন হতো। বিকাশের মাধ্যমে এখন এই পুরো প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়েছে। এই ডিজিটাল ব্যবস্থায় বেতন পাওয়ার পর শ্রমিকরা শুধু টাকা তোলাতেই সীমাবদ্ধ থাকছেন না। বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জসহ দৈনন্দিন বিভিন্ন সেবায় তারা বিকাশ ব্যবহার করতে পারছেন। বিকাশের চিফ কমার্শিয়াল অফিসার আলী আহম্মেদের মতে, এর ফলে চা-শ্রমিকেরা দেশের অন্যান্য মানুষের মতো বিকাশের সব সুবিধা পাচ্ছেন এবং মূলধারার আর্থিক সেবার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

নগদ টাকার নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে ডিজিটাল লেনদেনে যাওয়ার এই উদ্যোগ শ্রমজীবী মানুষের আর্থিক জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পঞ্চগড়ের এই চা-বাগান থেকে শুরু হওয়া পরিবর্তনটি আস্তে আস্তে আরও বিস্তৃত হবে এবং দেশের অন্যান্য চা-বাগানেও এই ধরনের ডিজিটাল বেতন ব্যবস্থা চালু হতে পারে।