রাজধানীর মতিঝিলের বিআরটিসি বাস ডিপোতে বৃহস্পতিবারের সকালটি অন্য দিনের তুলনায় কিছুটা নিস্তেজ কেটেছিল। ‘পিংক বাস’ নামে পরিচিত নতুন বাস সেবার নারী চালকরা প্রথম দিনের মতো কথা বলতে উৎসাহ দেখাচ্ছিলেন না। বেশির ভাগই সংবাদকর্মীর সঙ্গে আলাপচারিতায় রাজি হননি। যাঁরা কথা বলেছেন, তাঁদের মুখে ছিল একই সঙ্গে আক্ষেপ ও অটল সংকল্পের সুর—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু সংবাদমাধ্যমে যে ট্রল ও আজেবাজে মন্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে, তা তাঁদের হতাশ করেছে; তবু তাঁরা পিছিয়ে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা করছেন না।

গত মঙ্গলবার ঢাকা, বগুড়া ও চট্টগ্রামে ১৩টি রুটে ১৪টি বাস চালু করে বিটিআরসি। এর মধ্যে ঢাকায় ১০টি রুটে একটি একতলা ও নয়টি দ্বিতল গোলাপি রঙের বাস চলছে। সম্পূর্ণ নারীদের পরিচালনায় নারীদের জন্য এই সেবাটি প্রথমবারের মতো শুরু হয়েছে। এর আগে অপ্রতুল সংখ্যা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে অনুরূপ উদ্যোগ সফল হতে পারেনি। বাসযাত্রীরা স্বস্তি প্রকাশ করলেও একাংশের মতে, পুরো গণপরিবহন ব্যবস্থাকে নারীদের নিরাপদে চলার উপযোগী না করে আলাদা সেবা দেওয়া সঠিক পথ নয়। কম সংখ্যক বাসের কারণে দীর্ঘ অপেক্ষা ও আগ্রহ হারানোর ঝুঁকিও রয়েছে। অন্যদিকে, প্রচণ্ড নারীবিদ্বেষী মনোভাব প্রকাশ করে এক পক্ষ দাবি করছে, নারীরা বাস চালানোর উপযুক্ত নন; ভিউয়ের প্রতিযোগিতায় কিছু সংবাদমাধ্যমও নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে।

মতিঝিল ডিপোতে গিয়ে জানা যায়, বিটিআরসির কর্মকর্তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা এসেছে—নারী বাস নিয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না কর্মকর্তারা। সংবাদমাধ্যমে প্রচারেও মন্ত্রণালয় আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বর্তমানে মাত্র ১৫ জন চালক ও ২৪ জন নারী কনডাক্টর রয়েছেন। বাসে আপাতত পুরুষ প্রশিক্ষক রাখা হচ্ছে চালনার তদারকির জন্য। নতুন ৩২ আসনের ১০০টি ইলেকট্রিক বাস সংযোজন ও চালকের সংখ্যা বৃদ্ধি না পাওয়া পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমের প্রচার কম রাখার ইচ্ছা তাঁদের। ডিপোতে নারী চালকদের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি পেতেও বেশ ঝক্কি পোহাতে হয়। সকাল আটটায় নির্ধারিত রুটে গাড়ি চালিয়ে ডিপোতে ফিরে আসা চালকরা অপেক্ষাগারে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এখন শুধু সকাল আটটা ও বিকেল চারটায় ট্রিপ দিচ্ছেন তাঁরা; বাকি সময় বাসগুলো ডিপোতেই থাকছে।

এই চালকদের অন্যতম খাদিজা আক্তার (২৮)। একসময় গৃহিণী ছিলেন তিনি। ২০২১ সালে গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়ে পরে প্রশিক্ষক হন। পিংক বাসের চালক হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার আগে গাজীপুরে এক মাস ১৪ দিনের প্রশিক্ষণও সম্পন্ন করেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি নিজের মুঠোফোন খুলে দেখালেন—তাঁর ছবি দিয়ে কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেনস্তা করা হচ্ছে। তবু তাঁর কণ্ঠে ছিল গর্ব ও দৃঢ়তার মিশ্রণ। তিনি বলেন, আগে থেকেই গাড়ি চালাতে জানতেন বলে বাসের নিয়ন্ত্রণ নিতে বেশি সময় লাগেনি। একজন নারী হয়ে অন্য নারীকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তাঁকে আনন্দ ও শক্তি দুটোই দিচ্ছে। যাত্রীদের কেউ কেউ বলেছেন, ‘আপু, আপনি আমাদের গর্ব; খুব সাবধানে চালাবেন। আপনারাই নারীদের বিশ্বের কাছে তুলে ধরবেন।’

কিছু ভিডিও ও কনটেন্ট নির্মাতার ঠাট্টাবিদ্রূপ দেখে তিনি হতাশ হয়েছেন বলে জানান। ‘কিছু কিছু ভিডিও দেখেছি। কিছু কিছু কনটেন্ট নির্মাতা বিষয়টি ইতিবাচকভাবে না নিয়ে ঠাট্টাবিদ্রূপ করছেন। আমি তাঁদের উদ্দেশে বলতে চাই, আমাদের কোনো রকম প্রতিবন্ধকতা দিয়ে দমাতে পারবেন না আপনারা। আমরা নারীরা দেশের যত ধরনের খাত রয়েছে, সব জায়গায় সফলভাবে কাজ করে যাব,’ বলেন তিনি। চালক হওয়ার আগে পরিবার থেকে পূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছেন খাদিজা। বাবার বাড়ি ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন সাহস জুগিয়েছেন; চাকরিজীবী স্বামী সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছেন। অনেক নেতিবাচক মন্তব্য উপেক্ষা করেছেন তিনি। ‘পেছনে লোকে অনেক কিছু বলে। এখন আমরা যদি সেসব কথা ধরে মন খারাপ করে বসে থাকি, তাহলে আমাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে,’ বলেন খাদিজা। তিনি নারী যাত্রীদের প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, নেতিবাচক মন্তব্যে ভয় পেয়ে যেন কেউ সেবা থেকে বঞ্চিত না হন।

আরেক চালক মোসাম্মৎ সাথী খাতুন (৩০)। ছয় বছর আগে বিআরটিসিতে প্রশিক্ষণ নেন; তখন ডিগ্রি পাস ছিলেন। দুই বছর মানিকগঞ্জে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। বর্তমানে এলএলবি করছেন। স্বামী ও একমাত্র সন্তান নিয়ে সাভার ইপিজেড এলাকায় থাকেন। তাঁর রুট মিরপুর ১০ থেকে মতিঝিল। সকাল ছয়টায় বাসা থেকে রওনা দিয়ে আটটার মধ্যে কর্মস্থলে পৌঁছান। তিনি বলেন, নারী যাত্রীদের সেবা দিতে পেরে ভালো লাগছে; নামার সময় ধন্যবাদ জানান অনেকেই। অন্য বাসের চালকরাও উৎসাহ দেন। ‘কিছু আজেবাজে লোক নানা কথা বলবেই। সেসব কথায় কিছু মনে করছি না,’ বলেন তিনি। তাঁর ভাবি তাসলিমা পারভীন বগুড়ায় পিংক বাসের চালক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। ভাই ও স্বামী দুজনেই ট্রাকচালক; ভাই সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দিয়েছেন। বাবা বলতেন, ‘মেয়েরা বিমান চালায়, ট্রেন চালায়—তুমি কেন পারবে না।’ প্রশিক্ষণের সময় আশপাশের অনেকে আজেবাজে কথা বললেও সাথী তা কানে নেননি। ‘মানুষের কথা কানে নিলে তো জীবনে উন্নতি করা যাবে না,’ মন্তব্য তাঁর। তিনি বিশ্বাস করেন, আত্মবিশ্বাস থাকলে ভালো করা সম্ভব এবং বেকার নারীরা তাঁদের দেখে উৎসাহ পাবেন।

তিতুমীর কলেজ থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে স্নাতকোত্তর মোসাম্মৎ রাবেয়া খাতুনও এই দলের অংশ। ২০১২ সালে ব্র্যাকের একটি প্রকল্প থেকে বিনামূল্যে গাড়ি চালানো শেখেন। ২০১৪ থেকে ২০২০ পর্যন্ত ব্র্যাকে চাকরি করেন; পরে বিআরটিসিতে প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ২০২৪ সালে ভারী যানবাহন চালানোর লাইসেন্স পান। স্বামী ও সন্তান নিয়ে ঢাকার মোহাম্মদপুরে থাকেন। উদ্বোধনের দিনে ভিডিও সাক্ষাৎকার দিলেও আজ তিনি ম্রিয়মাণ। অনেক অনুরোধেও ক্যামেরার সামনে আসতে রাজি হননি। ‘আপনার সঙ্গে কথা বলতে থাকি, সেগুলো লিখে দিয়েন, ভিডিও করার দরকার নেই,’ বলেন তিনি। ট্রলের কারণে ভিডিও এড়াচ্ছেন কিনা জানতে চাইলে জানান, ‘অনেকে যেকোনো কাজ করলেই ট্রল করে। ভালো কাজ করলে কত দিন টিকে থাকতে পারবেন, সেটা নিয়ে প্রথমেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে মারবে... এই চ্যালেঞ্জ একা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সবার সহযোগিতা লাগবে। সড়কে চলার সময় সবাই যদি নিয়ম মেনে চলেন, তাহলে চালকদের এত চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে না।’ গাড়ি চালানোকে পেশা হিসেবে নেওয়ার সময় পরিবারের বাধার মুখে পড়েছিলেন তিনি। ‘চালক’ শব্দটিকে অনেকে নেতিবাচকভাবে নেন বলে উল্লেখ করে রাবেয়া বলেন, ‘কে কী বলেছে শোনার বিষয় না। বিশ্বাস আছে, এগিয়ে যাব। অনেক বেকার শিক্ষিত মেয়ে আছেন, তাঁরা আমাদের দেখে উৎসাহিত হবেন।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক মন্তব্যের জেরে আজ আরও দুজন চালক কথা বলতে চাননি। উদ্বোধনী দিনে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপ করলেও আজ তাঁরা বলেন, কথা বললেই আবার হেনস্তার শিকার হতে হবে। কাজের মাধ্যমেই দক্ষতার প্রমাণ দিতে চান তাঁরা। হতাশা প্রকাশ করে বলেন, তাঁদেরও পরিবার ও স্বজন রয়েছে; এই ধরনের ট্রল সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে—যা নেতিবাচক মন্তব্যকারীরা ভাবছেন না। সব মিলিয়ে, হেনস্তা ও ঠাট্টার মাঝেও নারী চালকরা স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছেন—চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছেন, দমে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা তাঁদের নেই। পরিবহন খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি গণপরিবহনের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার উন্নতির দাবিও তাঁদের কণ্ঠে স্পষ্ট।