আজ থেকে ঠিক ৭০ বছর আগের এই দিনে, ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে মুক্তি পেয়েছিল ‘মুখ ও মুখোশ’। এটিই ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নির্মিত প্রথম বাংলা সবাক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এই একটি সিনেমার সাফল্য প্রমাণ করেছিল, স্থানীয় মাটিতে বাংলা ভাষায় পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র তৈরি সম্পূর্ণ সম্ভব। আর সেই সাহসী উদ্যোগের উপর দাঁড়িয়েই পরবর্তী সাত দশকে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের পুরো চলচ্চিত্রশিল্প।

পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক চলচ্চিত্রটির উদ্বোধন করেন। পরিচালনা করেন আবদুল জব্বার খান। চ্যালেঞ্জ ছিল বিশাল, কেননা পরিচালক চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানতেন না, কিন্তু তিনি স্বপ্ন দেখতে জানতেন। আজকের এই দিনটি শুধু একটি সিনেমা মুক্তির নয়, বরং দেশের সিনেমার জন্মদিনও।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে কোনও স্থানীয় চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কলকাতা বাংলা সিনেমার মূল কেন্দ্র ছিল, আর লাহোর ছিল উর্দু চলচ্চিত্রের পীঠস্থান। এই অঞ্চলের প্রেক্ষাগৃহগুলোতে কেবল কলকাতা, হিন্দি, উর্দু ও হলিউডের ছবিই চলত। ১৯৫৩ সালে এক বিশেষ সভায় গুলিস্তান সিনেমা হলের মালিক জোর দিয়ে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের আর্দ্র আবহাওয়ায় চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব নয়। তার এই মন্তব্যের কড়া প্রতিবাদ জানান নাট্যকর্মী আবদুল জব্বার খান। সেখানেই তিনি ঘোষণা দেন, তিনি নাটক নির্মাণ করে দেখাবেন। আর সেই চ্যালেঞ্জই ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দেয়।

যদিও চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করলেও, আবদুল জব্বার খান ছবি নির্মাণের কোনও পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। নিজের লেখা জনপ্রিয় নাটক ‘ডাকাত’-কে চিত্রনাট্যে রূপ দিয়ে তিনি কাজ শুরু করেন। কলকাতা থেকে প্রায় পাঁচ হাজার টাকায় একটি পুরনো, মরিচা ধরা আইমো ক্যামেরা কেনা হয়। শব্দ ধারণের একমাত্র ভরসা ছিল একটি সাধারণ টেপ রেকর্ডার। অভিনেতা, কলাকুশলী, স্টুডিও বা ল্যাব — কোনও কিছুই ছিল না।

সে সময়ের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল নারী অভিনয়শিল্পী খুঁজে পাওয়া। সমাজের রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মেয়েরা ছবিতে কাজ করতে আগ্রহী ছিলেন না। সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেওয়ার পর এগিয়ে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী জহরত আরা, ইডেন কলেজের পিয়ারী বেগম ও কলকাতার শিল্পী পূর্ণিমা সেনগুপ্ত। পূর্ণিমা সেনগুপ্ত নায়িকা কুলসুমের ভূমিকায় অভিনয় করেন। পরিচালক খান নিজেই অভিনয় করেন প্রধান পুরুষ চরিত্র আফজলের। অভিনেতা ইনাম আহমেদের ছিলেন খল চরিত্রে। এই দলের প্রায় কেউই আগে সিনেমায় কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল না এবং অনেকেই কোনও পারিশ্রমিক নেননি।

১৯৫৩ সালের শেষভাগে শুরু হয় শুটিং। বুড়িগঙ্গার ওপারের কালীগঞ্জ, লালমাটিয়া ও তেজগাঁওয়ের জঙ্গল-সহ ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় দৃশ্যধারণ করা হয়। প্রায় দুই বছর পর কাজ শেষ হয় ১৯৫৫ সালের অক্টোবরে। কিন্তু ছবিটির কাজ সম্পন্ন করতে লাহোরের শাহনূর স্টুডিওতে পাঠাতে হয়, কারণ পূর্ব পাকিস্তানে তখন কোনও ফিল্ম ল্যাব ছিল না। সেখানে নেগেটিভ ডেভেলপমেন্ট ও প্রিন্ট তৈরি সম্পন্ন হয়। কিন্তু সমস্ত প্রতিকূলতা পেরিয়েও ছবি মুক্তির পথে বাধা এলো। ঢাকার পরিবেশকেরা স্থানীয় ছবি দর্শক দেখবে না ভেবে মুক্তি দিতে রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত ‘পাকিস্তান ফিল্ম ট্রাস্ট’ ও ‘পাকিস্তান ফিল্ম সার্ভিস’ দায়িত্ব নিলে ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট ঐতিহাসিক মুহূর্ত আসে।

‘মুখ ও মুখোশ’ শুধু একজন পরিচালকের নয়, এটি ছিল একদল স্বপ্নের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। সংগীত পরিচালনা করেছিলেন কিংবদন্তি সুরকার সমর দাস, গান গেয়েছিলেন শিল্পী আবদুল আলীম ও মাহবুবা হাসনাত। নৃত্য পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন গওহর জামিল। তাদের এই আত্মত্যাগ ও অদম্য সাহসের কারণেই জন্ম নিয়েছিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের ভিত্তি।

আজ সাত দশক পরে ফিরে তাকালে পরিষ্কার হয়, এই শিল্পটি অনেক উত্থান-পতনের সাক্ষী। একসময় বছর দে শ'র বেশি ছবি নির্মাণ হতো এবং হাজার খানেক সিনেমা হল ছিল। সেই স্বর্ণযুগ এখন অতীত। বর্তমানে সারা দেশে নিয়মিত চালু প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা মাত্র ৫০ থেকে ৬০টি। দর্শক এখন বহুমুখী বিনোদন খুঁজে।

তবে চলচ্চিত্রটি অতীতের চেয়ে এখন প্রযুক্তিগত দিকে বেশি এগিয়ে। আন্তর্জাতিক মানের সব সুবিধাই এখন ঢাকায় রয়েছে। কিন্তু ভালো গল্প ও দুরদর্শী নির্মাতার অভাবই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সম্প্রতি তরুণ নির্মাতাদের হাতে কিছু কম বাজেটের মানসম্মত ছবি বাণিজ্যিক সফলতা পেয়েছে, যা প্রমাণ করে ভালো কন্টেন্ট পেলে দর্শক এখনও প্রেক্ষাগৃহে আসেন।

‘মুখ ও মুখোশ’-এর ৭০তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে রোববার চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে একটি বিশেষ পোস্টার প্রেতর্শনীর আয়োজন করা হয়। সেখানে চলচ্চিত্রের ইতিহাসভিত্তিক পোস্টারের পাশাপাশি ইমপ্রেস টেলিফিল্মের জনপ্রিয় সিনেমার পোস্টারও প্রদর্শিত হয়। অনুষ্ঠানে ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম, নির্মাতা কাজী হায়াৎ, মতিন রহমান ও সোহেল আরমানসহ চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা সাত দশকের যাত্রাকে গৌরবের ইতিহাস বললেও বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক বলেন, ভালো বিনোদনের ছবি নির্মাণ করলে দর্শক অবশ্যই হলে ফিরবেন। আর কাজী হায়াতের মতে, সিনেমা কখনো বিলীন হবে না এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সিনেপ্লেক্স নির্মিত হলে চলচ্চিত্র শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।