নতুন কেনা গাড়ি চালিয়ে উচ্ছ্বসিত এক তরুণী হাসপাতালে গিয়েছেন মাকে প্রথম আয় দেখানোর জন্য। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছে দেখেন, মা আর নেই—তাঁকে সাদা চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ববিতা দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তাঁর জীবনের এই চরম বিয়োগান্তক ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। আনিসুল হকের সঞ্চালনায় ‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো’ অনুষ্ঠানে নিজের শৈশব, বেড়ে ওঠা এবং সিনেমায় জড়িয়ে পড়ার গল্প অকপটে তুলে ধরেন তিনি।

১৯৫৩ সালে বাগেরহাটে ফরিদা আক্তার পপির জন্ম। বাবা সরকারি চাকরিজীবী, মা ছিলেন লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের শিক্ষিত চিকিৎসক ও সংস্কৃতি মনা। সেই মা-ই সন্তানদের লেখাপড়ার পাশাপাশি গান, নৃত্য ও আবৃত্তি চর্চার গুরুত্ব শিখিয়েছিলেন। বড় বোন সুচন্দা চলচ্চিত্রে কাজ করলেও ববিতার নিজের অভিনয়ের প্রতি প্রথম দিকে তীব্র অনীহা ছিল। সুচন্দার শুটিংয়ের কষ্ট দেখে তিনি মনস্থির করেছিলেন, কখারও সিনেমা করবেন না।

তবে দুলাভাই কিংবদন্তি নির্মাতা জহির রায়হানের পুনর্বার অনুরোধে মায়ের কথা রাখতে গিয়ে প্রথম ছবি ‘সংসার’-এ নাম লেখান ‘সুবর্ণ’ নামে। ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যর্থ হলে জহির রায়হান ও চিত্রগ্রাহক আফজাল চৌধুরীর সহায়তায় উর্দু ছবি ‘জ্বলতে সুরাজ কে নিচে’ দিয়ে ‘ববিতা’ নাম ধারণ করেন তিনি। এরপর বাংলা ছবি ‘শেষ পর্যন্ত’ (১৯৬৯) দিয়ে রাজ্জাকের বিপরীতে সত্যিকারের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয়।

ঠিক এই সাফল্যর শুরুতেই ঘটে মর্মান্তিক পরিণতি। ‘শেষ পর্যন্ত’ মুক্তির দিন ১৪ আগস্ট সবার সাথে দেখা করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বারো হাজার টাকা পারিশ্রমিকের টয়োটা গাড়িটি নিয়ে মায়ের হাসপাতালে পৌঁছানোর পরই একটি ছোট ছেলে তাঁকে তাড়া দিয়ে নিয়ে যায় একটি কক্ষে। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, ‘মাকে সাদা চাদর দিয়ে ঢাকা হয়েছে।’ সেসময় বয়স আরও কম ছিল উল্লেখ করে ববিতা আবেগতাপিত কণ্ঠে বলেন, সেই দিনটি আর গাড়িটি মাকে দেখাতে না পারার দুঃখ আজও রয়ে গেছে।

সাক্ষাৎকারে উঠে আসে আন্তর্জাতিক বৃত্ত। একবার এফডিসিতে এক ভদ্রলোক তাঁর অসংখ্য ছবি তুলেছিলেন। পরে জানা যায়, সেই ছবিগুলো গিয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের কাছে। ‘মানিকদা’ ছবি দেখেই বলেছিলেন, ‘ইউরেকা! আমি পেয়ে গেছি। আমার অরঙ্গ বউকে পেয়ে গেছি।’ কলকাতায় টেস্টের জন্য যাওয়ার সময়ে অতিরিক্ত সাজুগুজু করায় সত্যজিতের ধমক খাওয়ার ঘটনাও হাসিমুখে স্মরণ করেন ববিতা। পরীনে ‘অশনি সংকেত’-এর ‘অনঙ্গ বউ’ চরিত্রের মাধ্যমেই তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতির স্বাদ পান।

কর্ম জীবনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজ্জাক ছিলেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সহশিল্পী, আর জাফর ইকবালের সাথে জুটিকে দর্শকরা একটু বেশিই রোমান্টিকভাবে দেখতেন। ‘নয়নমণি’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’-র মতো গ্রামীণ ছবির জন্য আমজাদ হোসেন তাঁর অতি প্রিয় পরিচালক। ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’র সেই বিখ্যাত সংলাপ— ‘ফার্স্ট ক্লাস? কিয়ের ফার্স্ট ক্লাস? আমরা হক্কলেই এক ক্লাসের মানুষ।’— এ কথা এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রায় ২৭৫টি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি ‘পোকা মাকড়ের ঘর বসতি’-র মতো ছবি প্রযোজনা করে জাতীয় পুরস্কারও জিতেছেন।

বর্তমানে তিনি ছবি করছেন না, কারণ নতুন গল্প ও নির্মাণ ধারা তাঁর ভালো লাগে না। তবুও শেষ বয়সে এসে জীবনের ব্যস্ততা থেকে পাওয়া ফুরসতে তিনি ভ্রমণ করছেন, যা আগে কখনই করা হয়নি। দর্শকদের উদ্দেশ্যে তাঁর বার্তা, ‘আমি ববিতা হয়েছি আমার প্রিয় দর্শকবৃন্দের জন্য। আপনারা দোয়া করবেন, ভালো থাকি। এখন সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখবেন।’ আর যদি কোনো সময় ভালো গল্প ও চরিত্র পাই, তবে শেষ বলে কিছু নেই বলে তিনি অভিনয়েও ফিরতে চান।