বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঘিরে মানবমনের অনুসন্ধান যেন ফুরোবার নয়। নিজের গভীর অনুভূতিকে শৈল্পিক রূপ দিতে মানুষ যখনই তাঁর দ্বারস্থ হয়, রবীন্দ্রনাথের লেখা আনন্দ-বেদনার এক নিবিড় দোলায় পুরো অস্তিত্বকে শিহরিত করে তোলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংরেজ কবি উইলফ্রেড আওয়েন যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করার সময় তাঁর বুকপকেটে থাকা নোটবইতে রবীন্দ্রনাথের অনূদিত লাইন ‘যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেন যাই যা দেখেছি যা পেয়েছি তুলনা তার নাই’ লেখা ছিল। রবিঠাকুরের ছন্দোবদ্ধ বাণীই হয়ে উঠেছিল আওয়েনের শেষ চেতনার উচ্চারণ।

জীবনের একেবারে শুরুতে মাকে হারানো রবীন্দ্রনাথ নিজের থেকে মাত্র দুই বছরের বড় বউদি কাদম্বরী দেবীর কাছ থেকে পেয়েছিলেন স্নেহ, মমতা ও একান্ত সখ্যের আশ্রয়। শৈশব, বাল্য ও কৈশোর পেরোনোর সময়কালে একই ঠাকুরবাড়ির পরিশীলিত পরিবেশে বেড়ে ওঠেন তাঁরা। বাড়ির দৈনন্দিন সংস্কৃতিচর্চার অংশ হিসেবে গান, নাটক ও কবিতা ছিল স্বাভাবিক বিষয়। খুব সাধারণ পরিবার থেকে আসার পরও কাদম্বরী ঠাকুরবাড়ির সংস্পর্শে ও নিজের চেষ্টায় হয়ে উঠেছিলেন কবিতার সমঝদার এবং নাটকের শিল্পী। তিনি ছিলেন কবির উৎসাহী পাঠিকা, সমালোচক ও প্রেরণাদাত্রী।

কিন্তু কাদম্বরীর স্বামী এবং রবীন্দ্রনাথের অগ্রজ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তাঁর মানসিক মিল ছিল না। তেরো বছরের ব্যবধান আর রুচি-বিদ্যার পার্থক্য দূর করা গেলেও বয়সের ফারাক মেটেনি। স্বামী তার স্ত্রীর মানসিক বেদনার খবর রাখতেন না অথবা রাখতে আগ্রহী ছিলেন না। এই পরিস্থিতিতে দেবর রবীন্দ্রনাথের সাহচর্যই কাদম্বরীর একমাত্র শান্তি ও সান্ত্বনা হয়ে উঠেছিল। সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এক নারীর অসাধারণ প্রতিভা ঠাকুরবাড়ির উচ্চশ্রেণির কয়েকজনের মনে ঈর্ষার আগুন ধরায়। বিলেতফেরত বড় জা জ্ঞানদানন্দিনী দেবী কাদম্বরীর প্রশংসা সহ্য করতে না পেরে তাকে কোণঠাসা করে ফেলেন। সাহিত্যসভার স্থানান্তর ঘটে জ্ঞানদানন্দিনীর বাড়িতে। সবচেয়ে নিষ্ঠুর আচরণ ছিল অন্দরমহলে কাদম্বরীকে নিঃসন্তান বা বাঁজা বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা।

রবীন্দ্রনাথের বিয়ের মাত্র তিন-চার মাস পর নিঃসঙ্গ ও একাকী কাদম্বরী দেবী আত্মহত্যা করেন। কথিত আছে, তাঁর আত্মার অভিশাপ ঠাকুরবাড়িকে স্পর্শ করেছিল। জ্ঞানদানন্দিনী যেভাবে অন্দরমহলকে কাদম্বরীর বন্ধুত্যের সম্পর্ক নিয়ে কটাক্ষ করতে প্ররোচিত করেছিলেন, তারই পরিণতি হিসেবে তার একমাত্র কন্যা অত্যন্ত গুণী ও বিদুষী ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী কাদম্বরীরই মতো সন্তানহীনা থেকে যান। রবীন্দ্রনাথ হয়তো সেই শোকাকুল মুহূর্তেই লিখেছিলেন, ‘হৃদয়, হৃদয় মোর, সাধ কি যায় রে তোর/ ঘুমাইতে ওই মৃত তারাটির পাশে’।