ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটির উপকণ্ঠে দুটি সাধারণ গুদাম থেকে সম্প্রতি বিপুল পরিমাণ নকল বিলাসপণ্য উদ্ধার করেছে দেশটির পুলিশ। অভিযানে ২৩ হাজার জোড়ার বেশি স্যান্ডেল জব্দ করা হয়, যেখানে নাইকি, অ্যাডিডাস, ক্রকস ও গুচির লোগো ব্যবহার করা হয়েছিল। এসব পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি ভিয়েতনামি ডং, যা মার্কিন ডলারে প্রায় ৭৬ হাজার। তবে এই অভিযান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বহু বছর ধরেই ভিয়েতনামে প্রকাশ্যেই তৈরি ও বিক্রি হচ্ছে নকল বিলাসদ্রব্য। দেশটির খোলাবাজারে ৯০০ ডলারের আসল স্যান্ডেলের নকল সংস্করণ মিলছে মাত্র ৩০ ডলারে, আর শ্যানেলের ব্যাগ, প্রাডার টি-শার্ট ও রোলেক্স ঘড়ির জাল সংস্করণও সহজলভ্য।

দীর্ঘদিন ধরে নকল পণ্যের বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ভিয়েতনাম এখন আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির কারণে দেশটিতে এবারের অভিযানের মাত্রা আগের চেয়ে অনেক বেশি। গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর ভিয়েতনামকে ‘অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিদেশি দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করে, যা ১৩ বছরের মধ্যে প্রথম কোনো দেশের বেলায় ঘটলো। ওই প্রতিবেদনে ভিয়েতনামকে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ অধিকার লঙ্ঘনে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরাধীও বলা হয়। নতুন শুল্ক আরোপের আশঙ্কায় ভিয়েতনাম সরকার মে মাসে প্রতিশ্রুতি দেয়, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অন্তত ২০ শতাংশ বেশি অভিযান চালানো হবে।

এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে সাইগন স্কয়ার ও বেন থান মার্কেটের মতো দেশটির বৃহত্তম নকল পণ্যের বাজারগুলোতে হানা দেয় কর্তৃপক্ষ। মে মাসের মাঝামাঝি এসব বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ নকল পণ্য জব্দ ও ১৯ হাজার ডলারের বেশি জরিমানা আদায় করা হয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের নজরদারির সঙ্গে অভ্যস্ত বিক্রেতারা এতে তেমন বিচলিত নন। সাইগন স্কয়ারের এক পোশাক বিক্রেতা থ্যান ট্রুক (ছদ্মনাম) জানান, বাজার পরিদর্শকেরা এলে আগেই বাঁশি বাজিয়ে সবাইকে সতর্ক করে দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, এখন অভিযান কঠোর হলেও অনেক দোকান সামনে ব্র্যান্ডের লোগোযুক্ত পণ্য কম রাখছে, কিন্তু পেছনের গুদামে এখনো মজুত আছে।

নকল পণ্যের বিরুদ্ধে এই কঠোর অবস্থান নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। হো চি মিন সিটি ও দা লাতে নিজস্ব পোশাক ব্র্যান্ডের মালিক থি নুগুয়েন বলেন, জাল পণ্য শুধু ডিজাইনারদের মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন করে না, বরং দেশের খুচরা বাজারকেও বিশৃঙ্খল করে তোলে। তাঁর মতে, ক্রেতারা নকল পণ্যের জন্য ৭৫ ডলার খরচ করতে রাজি, কিন্তু উন্নত কাপড় ও ভালো কারুকাজে তৈরি কাস্টম পোশাকের জন্য অর্ধেক দাম চাইলেও আপত্তি করেন। তিনি মনে করেন, এই অভিযানের ফলে পরিচ্ছন্ন ও ন্যায্য ব্যবসায়িক পরিবেশ ফিরে আসতে পারে। অন্যদিকে দা নাংয়ের অফিসকর্মী হুই নিয়মিত নকল ফুটবল জার্সি ও জুতা কেনেন। তাঁর ভাষায়, নকল পণ্য সস্তা ও সহজলভ্য বলেই এগুলো কিনতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন তিনি। ভিয়েতনামের অধিকাংশ মানুষের মাসিক গড় আয় ২২৫ ডলার হওয়ায় নকল পণ্যই নিম্ন আয়ের ক্রেতাদের জন্য একমাত্র ভরসা।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, নকল পণ্যের বাজারের মূল চালিকা হলো অর্থনৈতিক বাস্তবতা। প্রকৃত ক্রেতা ও নকল পণ্যের ক্রেতা প্রায় সম্পূর্ণ ভিন্ন হওয়ায় নকল পণ্যের কারণে আন্তর্জাতিক বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলোর প্রকৃত বিক্রির ক্ষতি সীমিত। তাঁদের মতে, নকল পণ্য না থাকলেও নিম্ন আয়ের মানুষ আসল পণ্য কিনত না, কারণ সামর্থ্য নেই এবং একটি ব্যাগের জন্য এত টাকা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও তারা বোঝে না। তবে সরকারের কঠোর অভিযানের কারণে উৎপাদক ও বিক্রেতারা আইন এড়ানোর নতুন উপায় বের করছে। যেমন নাইকির বদলে ‘মাইক’ নাম ব্যবহার বা নকশায় সামান্য পরিবর্তন আনা। স্থানীয় বিশেষজ্ঞ থি থান হুয়ং ত্রান বলেন, এমনভাবে নকশা পরিবর্তন করা হয় যেন আইনের জটিলতা না থাকে, কিন্তু ব্র্যান্ডের ভাবমূর্তি অটুট থাকে। তাঁর মতে, এই শিল্প পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়, যতদিন ক্রেতার চাহিদা থাকবে, বিক্রেতাও থাকবে।

এছাড়া ১০ জুন থান হোয়া প্রদেশে পুলিশ ১০ হাজারের বেশি নকল গয়না উৎপাদন ও বিক্রির একটি চক্রের সন্ধান পায়, যেখানে বুলগারি, কার্তিয়ে, লুইস ভিটন ও টিফানি অ্যান্ড কোংয়ের নকল পণ্য বিক্রি করে চক্রটি আনুমানিক ১১ লাখ ৪০ হাজার ডলার অবৈধ মুনাফা করেছিল। হো চি মিন সিটি ও হ্যানয়ের অনেক দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং পুলিশ গুদাম, পোশাকের দোকান ও জুতার বিক্রয়কেন্দ্রেও অভিযান চালিয়েছে।