আট বছরের মোবাশিরা মোসতারিনের কাছে টাকার মূল্য অন্য শিশুদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। অন্য কেউ চকলেট বা খেলনা কিনতে চাইলে সে জমিয়ে রাখে টাকা। তার একটাই স্বপ্ন— সেই টাকায় একদিন একটি সুন্দর চুলের ক্লিপ কেনা। অথচ যে মাথায় ক্লিপটি পরার কথা, সেখানে তিন বছর বয়স থেকেই কোনো চুল নেই।
বিরল জিনগত রোগ প্রজেরিয়ায় (শিশুকালে বুড়িয়ে যাওয়া) আক্রান্ত মোবাশিরার শরীরে রোগটির প্রায় সব উপসর্গই বিদ্যমান। তার ভ্রু নেই, চোখের পাপড়িও নেই। মাথাটি মুখের তুলনায় অস্বাভাবিক বড়। চেহারায় আট বছরের শিশু হলেও মনে হয় যেন ৬০ বছরের বৃদ্ধ। তবুও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে হাসে, নিজেকে সাজায়। সে জানে না তার শরীর কেন অন্য শিশুদের মতো নয়। সে শুধু জানে, মায়ের কাছে থাকতে, খেলতে আর বাঁচতে চায় সে।
পাঁচ বছর ঢাকার রাস্তায় কাটিয়ে সম্প্রতি জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের বাড়িতে ফিরেছে মোবাশিরা। তিন বোনের মধ্যে সে মেজ। তার হাঁটু, হাত-পায়ের গিঁট ফোলা, ত্বক কুঁচকে গেছে। শরীরের শিরাগুলো চামড়ার ওপর স্পষ্ট। পেট কিছুটা ফোলা। বাঁকানো নাকটি পাখির ঠোঁটের মতো দেখতে।
গত ১৫ আগস্ট মোবাশিরার মা কোহিনূর আক্তারের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হয়। তিনি বলেন, 'জানি না মেয়েটা আর কয় বছর বাঁচবে। তবে মেয়ে খুব বুদ্ধিমতী। আমার জন্য অনেক চিন্তা করে। টাকা পেলে চুলের ক্লিপ কেনার জন্য জমিয়ে রাখে। সেই টাকায় আমার ঋণের কিস্তি দিতে চায়।'
ছোটবেলা থেকে মোবাশিরাকে যত চিকিৎসক দেখানো হয়েছে, সবাই বলেছেন বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, অবস্থা তত খারাপ হচ্ছে। প্রতি মাসেই জ্বর, সর্দি বা কোনো না কোনো অসুখ লেগেই থাকে। তখন সারাক্ষণ কান্না করে, মায়ের কোল ছেড়ে নামতে চায় না। কোহিনূর বলেন, 'মেয়েরে কোলে নিয়া হাঁটতে হাঁটতে এমনও সময় গেছে তখন আমি দাঁড়িয়ে ঘুমাইতাম। এখনো ওর শরীর খারাপ থাকলে আমি সংসারের কোনো কাজ করতে পারি না।'
মেয়ের সামনে নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখেন কোহিনূর। কিন্তু আড়ালে গেলে কান্না থামাতে পারেন না। মেয়ের মাথায় আর চুল গজাবে কি না তা জানা নেই, কিন্তু মোবাশিরা তা মানতে চায় না। মাথায় গামছা পেঁচিয়ে চুল বানিয়ে তাতে বড় গোলাপি হেয়ার ব্যান্ড লাগিয়ে রাখে। সাজগোজ করে আয়নায় নিজেকে দেখে খুশি হয়।
কোহিনূর আক্তারের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের নাম 'মোবাশিরার আম্মু'। অ্যাকাউন্টের বায়োতে লেখা— 'মোবাশিরা প্রজেরিয়া আক্রান্ত। সবাই দোয়া করবেন। সাপোর্ট করে পাশে থাকবেন।' মেয়ের ছবি দিয়ে কখনো সবাইকে শুভ সকাল জানান তিনি। কখনো লাল টুকটুকে শাড়ি পরিয়ে বউয়ের মতো সাজিয়ে ছবি ও ভিডিও পোস্ট করেন। মেয়েকে বউ সাজানোর পেছনে মায়ের এক ধরনের অপূর্ণতার ভয় কাজ করে। কোহিনূর বলেন, 'মেয়েকে হয়তো কখনোই বউ সাজা অবস্থায় দেখার সুযোগ পাব না। তাই বউ সাজাই। মেয়ের জন্য সুন্দর জামা বানাই।'
মোবাশিরার ছবি দেখে বেশির ভাগ মানুষ ভালো কথা লেখেন, দোয়া করেন। তবে মাঝেমধ্যে নিষ্ঠুর মন্তব্যও আসে। কেউ লেখেন, 'ওকে তো ভূতের মতো দেখা যাচ্ছে।' কেউ লেখেন, 'ওকে দেখে হাসি পাচ্ছে।' এসব মন্তব্যে ভেঙে পড়েন কোহিনূর। তিনি বলেন, 'আমার চোখে তো মেয়ে এখনো অনেক সুন্দর। কিন্তু মানুষ খারাপ কথা বলে। মনটা খারাপ হয়।'
মোবাশিরার খালা সিনহা শিমুও ফেসবুকে নিয়মিত তার ছবি ও ভিডিও পোস্ট করেন। কেউ কেউ অভিযোগ তোলেন, ভিউ ব্যবসার জন্য শিশুটির ছবি প্রকাশ করা হচ্ছে। জবাবে সিনহা শিমু লেখেন, প্রজেরিয়া সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতেই তিনি এসব ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেন।
রোগের নাম জানতেই কেটে গেছে অনেক বছর। শরীরে পরিবর্তন শুরু হওয়ার পর মা-বাবা কম জায়গায় যাননি। চিকিৎসক দেখিয়েছেন, কবিরাজের কাছেও গেছেন। লাভ হয়নি, শুধু টাকা খরচ হয়েছে। এমনকি মেয়েকে 'জিনে-ভূতে ধরেছে'— এমন কথাও শুনতে হয়েছে তাদের। ফেসবুকে ছবি দেওয়ার পর অনেকে প্রজেরিয়ার কথা বলেন। তখনই প্রথম রোগটির নাম শোনেন তারা।
চলতি বছর মোবাশিরার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্য প্রজেরিয়া রিসার্চ ফাউন্ডেশন (পিআরএফ)। গত ২২ জানুয়ারি পাঠানো চিঠিতে মোবাশিরার রক্ত সংগ্রহের কথা জানানো হয়। কোহিনূর জানান, রক্তের নমুনা দিতে ঢাকায় এসেছিলেন তারা। মালিবাগের একটি ক্লিনিকে রক্ত নেওয়া হয়, পরে কুরিয়ারে পাঠানো হয়। তবে এখনো পরীক্ষার প্রতিবেদন পাননি তারা।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সাবেক ডিন অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ২০০৩ সালে এলএমএনএ জিন আবিষ্কারের পর রোগটি সম্পর্কে জানা সহজ হয়েছে। এই জিনে মিউটেশন হলে শরীরে ভুল প্রোটিন তৈরি হয়, ফলে কোষের নিউক্লিয়াস ভঙ্গুর হয়ে যায় এবং দেহের কোষগুলোর বয়োবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। শিশুর ১৮ থেকে ২৪ মাস বয়স থেকেই বয়োবৃদ্ধির লক্ষণ চোখে পড়ে। অল্প বয়সেই শিরায় মেদ জমে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি দেখা দেয়। এটি জিনবাহিত রোগ, এখন পর্যন্ত এর চিকিৎসা খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়। আক্রান্তরা সাধারণত গড়ে ২০ থেকে ২২ বছর বাঁচেন।
শৈশবেই বুড়িয়ে যাওয়া শিশু কেবল মোবাশিরা একা নয়। এর আগেও বেশ কয়েকজন শিশু এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। ২০১৬ সালে প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রজেরিয়ায় আক্রান্ত বায়েজিদ শিকদারের কথা জানানো হয়। ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাড়ে পাঁচ বছর বয়সে মারা যায় সে। এরপর আলোচনায় আসে হবিগঞ্জের নীতু আক্তার। ২০২৪ সালের জুনে ১৭ বছর বয়সে নিজের বাড়িতে মারা যায় সে।
প্রজেরিয়ায় আক্রান্ত মানেই যে খুব অল্প বয়সে মৃত্যু—বাংলাদেশের তুহিন ইসলাম রাজু তার ব্যতিক্রমী উদাহরণ। ১৯৯৭ সালে জয়পুরহাটে জন্ম। ২০১০ সালে গণমাধ্যমে আলোচনায় আসার সময় তাঁকে ৬০ বছর বয়সী বৃদ্ধের মতো মনে হতো। সেই তুহিনের বয়স এখন ২৯ বছর। মাদ্রাসায় ডিগ্রি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন তিনি। ২০২০ সালে বিয়ে করেছেন, সাড়ে তিন বছরের একটি মেয়েও আছে। অটোভ্যান চালিয়ে পুরো সংসার চালান তিনি। কিডনি ও মূত্রনালির সমস্যায় ভুগছেন, মাসে চিকিৎসার পেছনে পাঁচ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়। ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছেন বেশি দিন বাঁচবেন না, কিন্তু সেই আশঙ্কাকে পেছনে ফেলে এখনো বেঁচে আছেন।
মোবাশিরা প্রজেরিয়া কী তা বোঝে না, জানে না তার শরীর কেন এত দ্রুত বুড়িয়ে যাচ্ছে। সে শুধু জানে, মা তাকে সুন্দর জামা বানিয়ে দেন, সে সাজতে পারে। ভিডিও কলে কথা বলার সময় মায়ের পাশে ছিল মোবাশিরা। সুন্দর একটি জামা পরা। কে বানিয়ে দিয়েছে জানতে চাইলে এক গাল হেসে জানাল, মা বানিয়ে দিয়েছে। এরপর আর কথা বলতে চাইল না, অন্য একটি মুঠোফোনে কার্টুন দেখায় মনোযোগ দিল।
মোবাশিরা আর কত দিন বাঁচবে—এই প্রশ্ন প্রতিনিয়ত দগ্ধ করে কোহিনূরকে। তবে মেয়েটা বাঁচতে চায়। মা হিসেবে তিনিও চান, মেয়েটা ভালোভাবে বাঁচুক। প্রতি মাসে চিকিৎসার পেছনে টাকা খরচ হয়, মেয়েকে একটু ভালো খাবার খাওয়াতে হয়। অটোরিকশাচালক বাবার স্বল্প আয়ে সব সময় তা সম্ভব হয় না। আর্থিকসহ যেকোনোভাবে মোবাশিরাকে কেউ সহায়তা করতে চাইলে তা নিতে আপত্তি নেই বলে জানিয়েছেন কোহিনূর। তবে এই মায়ের সবচেয়ে বড় চাওয়াটা অন্য রকম— মেয়েটাকে দেখে কেউ যেন হাসাহাসি না করে, কটু কথা না বলে। কারণ, অন্যদের চোখে মোবাশিরা হয়তো 'বৃদ্ধ শিশু', কিন্তু মায়ের কাছে সে এখনো সেই ছোট্ট মেয়েটিই—যে চুল না থাকলেও চুলের ক্লিপ কেনার স্বপ্ন দেখে।




