শক্তি রূপান্তরের লক্ষ্যে নেদারল্যান্ডসে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে উত্তর সাগরের সক্রিয় প্রাকৃতিক গ্যাস প্ল্যাটফর্মে প্রথমবারের মতো সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদন সম্পন্ন করেছে দেশটির একটি উদ্ভাবনী প্রকল্প। 'পসহাইডন' নামের এই প্রকল্পটি বিশ্বে প্রথমবারের মতো সমুদ্রে বায়ুভিত্তিক বিদ্যুৎ, সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদন এবং প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনকে একীভূত করেছে।

ডাচ অর্থনৈতিক বিষয়ক ও জলবায়ু নীতি মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় গঠিত একাধিক প্রতিষ্ঠানের জোট এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। চলতি বছরের শেষ জুলাইয়ে হেগের শেভেনিংজেন এলাকা থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এনি এনার্জি নেদারল্যান্ডস পরিচালিত কিউ১৩এ-এ প্ল্যাটফর্মে প্রকল্পটির প্রথম ব্যাচের সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদন সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

একটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তর সাগরের ডাচ অংশে এটিই প্রথম 'সম্পূর্ণ বিদ্যুতায়িত উৎপাদন প্ল্যাটফর্ম'। এই প্রক্রিয়ায় সমুদ্রের পানি প্রথমে খনিজমুক্ত পানিতে রূপান্তরিত হয় এবং পরে তড়িৎ বিশ্লেষণের মাধ্যমে তা থেকে হাইড্রোজেন তৈরি করা হয়। প্ল্যাটফর্মটির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ আসছে অফশোর বায়ু খামার থেকে। এর পাশাপাশি স্বাভাবিকভাবে প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনও অব্যাহত রয়েছে।

প্ল্যাটফর্ম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এনির পাশাপাশি প্রকল্পটির অন্যান্য অংশীদারের মধ্যে রয়েছে ডেমে গ্রুপ, ইবিএন, এনেকো, এমারসন, গ্যাসুনি, হ্যাটেনবোরওয়াটার, ইনভেস্টা এক্সপার্টিজ সেন্ট্রাম, আইভি, নেল, নেক্সস্টেপ, এনজিটি, নোগাট, টাকুয়া এবং টিএনও।

এনি এনার্জি নেদারল্যান্ডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লেক্স ডি গ্রুট বলেন, সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে পসহাইডনের মাধ্যমে বিশ্বে প্রথম এই অর্জন সম্ভব হয়েছে দেখে সত্যিই বিস্ময়কর লাগছে। তিনি আরও বলেন, টেকসই প্রয়োজনে বিদ্যমান অফশোর প্ল্যাটফর্মের পুনর্ব্যবহার এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। উত্তর সাগরে ভবিষ্যতের অফশোর শক্তি ব্যবস্থার দিকে আমরা একসঙ্গে অর্থবহ পদক্ষেপ নিচ্ছি।

টিএনও-র শক্তি অবকাঠামোর ব্যবসায়িক পরিচালক রেনে পিটার্স এই প্রকল্পকে অফশোর বায়ু শক্তির ভিত্তিতে অফশোর হাইড্রোজেন উৎপাদন বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, এই পাইলট প্রকল্পটি মূল্যবান জ্ঞান এবং ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দেবে, যা বড় পরিসরে অফশোর হাইড্রোজেন উৎপাদনের বিকাশের জন্য অপরিহার্য। এটি ঝুঁকি কমাতে এবং খরচ আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে।

এমারসনের প্রসেস সিস্টেমস অ্যান্ড সল্যুশনস বিভাগের সভাপতি নাথান পেটাস সমুদ্রে সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদনকে বৈশ্বিক শক্তি রূপান্তরের জন্য 'একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত' বলে বর্ণনা করেছেন। ২০২২ সালে অংশীদারদের সঙ্গে যাত্রা শুরুর সময় তারা জানতেন যে সমুদ্রে বায়ু শক্তি, হাইড্রোজেন উৎপাদন এবং গ্যাস উৎপাদনকে একত্রিত করা বেশ বড় একটি চ্যালেঞ্জ হবে। আজ সেই সমন্বিত স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হয়েছে।

পেটাস উল্লেখ করেন, পসহাইডনের এই সাফল্যে এমারসনের অটোমেশন ও নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পানি বিশুদ্ধকরণ, তড়িৎ বিশ্লেষণ এবং গ্যাস মিশ্রণের জটিল প্রক্রিয়াগুলো নির্ভুলতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে পরিচালনা করতে এই প্রযুক্তি সহায়তা করেছে। দীর্ঘদিনের বিশ্বাস যে উন্নত ডিজিটাল সমাধান হাইড্রোজেন অর্থনীতিকে ত্বরান্বিত করার জন্য অপরিহার্য, এই প্রকল্প তা প্রমাণ করেছে। পসহাইডনের সাফল্য অভূতপূর্ব সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রকল্পের প্রথম সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদনের এই সাফল্যে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উত্তেজনার পাশাপাশি পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হয়েছে। সমুদ্রে একাধিক শক্তি ব্যবস্থার সমন্বয় এবং সামুদ্রিক পরিবেশে হাইড্রোজেন উৎপাদনের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি, প্রকল্পটির গবেষণা ও মডেলিং অফশোর হাইড্রোজেন স্থাপনার খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজনীয়তা এবং কার্যক্ষমতা বিশ্লেষণে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।

সর্বশেষ পরীক্ষা পর্যায়ে প্রাথমিকভাবে স্থিতিশীল সিস্টেম পরিচালনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদন করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে অফশোর বায়ু শক্তি উৎপাদনের ওঠানামার সঙ্গে সিস্টেমটি কতটা খাপ খাওয়াতে পারে তাও যাচাই করা হচ্ছে। নিরাপত্তা ও পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করে সম্পূর্ণ কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হচ্ছে এবং মূল্যবান ব্যবহারিক তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

চলতি বছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে পাইলট প্রকল্পের মূল ফলাফল বিশ্লেষণ করে হাইড্রোজেন খাতের সঙ্গে এবং নেদারল্যান্ডসের জলবায়ু ও সবুজ প্রবৃদ্ধি বিষয়ক মন্ত্রী স্টিন্টজে ভ্যান ভেলডোভেন-ভান ডের মিয়ারের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এই ফলাফলের ভিত্তিতে ইউরোপ ও তার বাইরে অফশোর সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদন সম্প্রসারণের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।

বিশ্বে বর্তমানে উৎপাদিত বেশিরভাগ হাইড্রোজেনই 'ধূসর' জাতের, যা স্টিম মিথেন রিফর্মিং নামক প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে তৈরি। এর পরে রয়েছে 'নীল' হাইড্রোজেন, যা একই প্রক্রিয়ায় তবে কার্বন ক্যাপচার ও স্টোরেজসহ উৎপাদিত হয়। সবশেষে 'সবুজ' হাইড্রোজেন, যা পসহাইডন প্রকল্পের মতো নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে পানি থেকে তড়িৎ বিশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরি হয়। তবে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সবুজ বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলেও বর্তমানে বিশ্বের মোট উৎপাদনের ১ শতাংশেরও কম নীল ও সবুজ হাইড্রোজেন। ভবিষ্যতে নিট-শূন্য অর্থনীতিতে হাইড্রোজেন কার্যকর ভূমিকা রাখতে হলে এই চিত্রের পরিবর্তন প্রয়োজন।