চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র নিয়ে নানা অনিয়ম ও ত্রুটির ঘটনা সামনে এসেছে, যার জেরে প্রশ্ন প্রণয়ন পদ্ধতিতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের পদক্ষেপে এবার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরিশোধন ও বিতরণ—তিনটি স্তরেই কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
শুরু থেকেই এবারের পরীক্ষায় অসংগতির অভিযোগ উঠেছে। পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুল থাকায় শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সংসদে জানান, ওই দুটি প্রশ্নের জন্য সব পরীক্ষার্থীকে পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে। ভুল প্রশ্ন তৈরির দায়ে ওই বিষয়ের পরিশোধনকারী চার শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্নেও অসামঞ্জস্যের অভিযোগ তুলেছেন পরীক্ষার্থীরা। উত্তরার এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী জানান, উচ্চতর গণিতের একটি জানা প্রশ্নে অসংগতি থাকায় তিনি সেটির উত্তর না দিয়ে কম আয়ত্তের আরেকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য হন, যা পরীক্ষায় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
প্রশ্নপত্র বিতরণেও একাধিক কেন্দ্রে গরমিল দেখা গেছে। দিনাজপুরের বোচাগঞ্জে ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা প্রথম পত্রের বদলে দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নপত্র বিতরণ হয়, পরে তা ফিরিয়ে নিয়ে পাশের কেন্দ্র থেকে সঠিক প্রশ্নপত্র আনা হয়। এ ঘটনায় তিনজনকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বগুড়ার শিবগঞ্জে অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের পুরোনো সিলেবাসের প্রশ্নপত্রে ৪২ জন নিয়মিত শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়ার ঘটনায় রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড তদন্ত কমিটি করেছে। জামালপুরের আশেক মাহমুদ কলেজে শতাধিক নিয়মিত শিক্ষার্থীকে গত বছরের সিলেবাসের প্রশ্নপত্র দেওয়া হলে ১০০ উত্তরপত্র আলাদাভাবে মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত হয় এবং অধ্যক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরেও ১৪ জন পরীক্ষার্থী ২০২৫ সালের প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দেওয়ায় কেন্দ্র সচিবসহ তিন শিক্ষককে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্নপত্র তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা যায়, প্রতিটি বোর্ডে মাস্টার ট্রেইনার তালিকা থেকে চারজন প্রশ্ন প্রণয়নকারী আলাদা সেট তৈরি করেন। পরে চারজন মডারেটর তা যাচাই করেন। এবার নয়টি বোর্ডের জন্য ৩৬ সেট প্রস্তুত করে লটারির মাধ্যমে চার সেট বাছাই করা হয়, যার মধ্যে দুই সেট ছাপা হয়। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জেসমিন তাসলিমা বানু জানান, ভুল পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং পদার্থবিজ্ঞান ছাড়া বড় ধরনের ত্রুটি নেই। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান মনে করেন, বারবার এমন ঘটনা জবাবদিহির ঘাটতি ও অসতর্কতার পরিচয়। মডারেশনের পর প্রশ্নের মান যাচাইয়ের সুযোগ না থাকায় ভুল শনাক্ত করা যায় না বলে জানান বোর্ডের এক কর্মকর্তা।
এই পরিস্থিতিতে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড জানিয়েছে, আগামী পরীক্ষাগুলোতে দ্বিতীয়বার মডারেশনের ব্যবস্থা চালু করা হবে এবং ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্ন পরিশোধনে একজন ইংরেজি ভাষা শিক্ষক যুক্ত থাকবেন। অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন থেকে এই নতুন পদ্ধতি কার্যকর হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুলের পুনরাবৃত্তি রোধে শুধু নোটিশ নয়, প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।




