যুক্তরাষ্ট্রের কানেটিকাটের গভীর অরণ্যে এক গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে ১৪ বছর বয়সী কিশোর রদ্রি তখন স্পেনের বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখা থেকে বঞ্চিত। ২০১০ সালের সেই ফাইনালে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার গোলটি তিনি দেখেছিলেন ক্যাম্পের এক পরামর্শকের কম্পিউটারে। পড়াশোনায় অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া তাঁর পরিবারের ইচ্ছা ছিল তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের হাইস্কুলে অন্তত এক বছর পড়ানোর, কিন্তু ফুটবলের প্রতি তীব্র আকর্ষণ তা হতে দেয়নি। তবুও যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া হয়েছিল ঠিকই—যদিও রদ্রির মতে, সেটি ছিল ভুল সময়। সেই ঘটনার ষোলো বছর পর ভাগ্যের পরিহাস দেখুন, একই যুক্তরাষ্ট্রেই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের মোকাবিলা করছে স্পেন, আর নেতৃত্ব দিচ্ছেন সেই কিশোরই।

চোটের কবল থেকে ফিরে আসা এই মিডফিল্ডার এখন স্পেনের রক্ষণে এক অটল প্রাচীর। ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচে আইমেরিক লাপোর্তে ও পাউ কুবারসিকে নিয়ে তিনি যেন বারমুডা ট্রায়াঙ্গল গড়েছিলেন—এমবাপ্পে, ওলিসে ও দেম্বেলেদের আক্রমণের 'নৌবহর' বারবার নিখোঁজ হয়েছে সেই জালে। পরিসংখ্যান বলছে, রদ্রি ১৫টি বল দখলের লড়াইয়ের মধ্যে ১১টিতে জয়ী হয়েছেন। আশ্চর্যের বিষয়, প্রতিরক্ষামূলক মিডফিল্ডার হিসেবে তাঁকে ফাউল করতে দেখা যাওয়ার কথা থাকলেও উল্টো ঘটনা ঘটেছে—ফরাসি খেলোয়াড়রা তাঁর কাছ থেকে বল পুনরুদ্ধার করতে তাঁকেই তিনবার ফাউল করেছেন, যা ম্যাচে যৌথভাবে সর্বোচ্চ।

পুরো বিশ্বকাপ জুড়েও একই ধারা অব্যাহত। সাত ম্যাচে তিনি গোলের সুযোগ তৈরি করার মতো পাস দিয়েছেন ৯টি, সফল পাসের হার ৯৩ শতাংশ (৬৫৬টি পাস)। যেহেতু তিনি মাঝমাঠের নিচের দিকে খেলেন, দূরপাল্লার পাস বেশি দিতে হয়—সেখানে তাঁর সফলতা ৭৮ শতাংশ। বাতাসে বল দখলের লড়াইয়ে জয়ের হার ৭৯ শতাংশ এবং সফল ট্যাকল ২২টি। এই রদ্রি এসিএল চোটের আগের রদ্রিরই প্রতিচ্ছবি। বরং বলা যায়, তিনি স্প্যানিশ রক্ষণব্যূহের ভরকেন্দ্রে পরিণত হয়েছেন—ফরাসি আক্রমণের সব তীব্রতা শুষে নেওয়ার কারণেই গোলকিপার উনাই সিমনকে কোনো সেভ করতে হয়নি। প্রতিপক্ষ তো এই টুর্নামেন্টের সেরা আক্রমণভাগ। অথচ রদ্রির উপস্থিতিতে ফরাসিরা পুরোপুরি নিষ্প্রভ।

ম্যাচ শেষে স্বাভাবিক নিরুত্তাপ কণ্ঠে রদ্রি বলেন, 'ধাপে ধাপে আমরা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলাম। দল রোমাঞ্চিত। দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠলাম। এখন আমাদের শান্ত থাকতে হবে এবং বিশ্রাম নিতে হবে।' সেমিফাইনালে সাড়ে ১২ কিলোমিটারের বেশি দৌড়ানোর পর ক্লান্তি স্বাভাবিক হলেও প্রশ্ন জাগে—এই রদ্রির কি আদৌ ক্লান্ত লাগে? স্পেনের জার্সি ও পায়ের তলায় বল দিলেই তিনি আবার সেই অক্লান্ত কর্মী হয়ে উঠবেন। ফুটবলের ভাষায় সুপারহিরো দুই ধরনের—এক দল আক্রমণ করে, অন্য দল আক্রমণ শোষণ করে। রদ্রি সেই বিরল শ্রেণিরও বিরল ফুটবলার, যিনি প্রতিপক্ষের সব অস্ত্রকে নিষ্ক্রিয় করে দেন নিজের অস্তিত্ব দিয়ে।

আর মাত্র একটি ম্যাচ জিতলেই ১৬ বছর আগের সেই কিশোর রদ্রির জীবনে ফিরে আসবে ৩০ বছর বয়সী পরিণত রদ্রি। সেই রোমাঞ্চকর সম্ভাবনা তাঁকে যেন আরও বেশি দায়িত্বশীল করে তুলেছে—ঠান্ডা মাথায় পরিচ্ছন্ন খেলা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা তাঁর কণ্ঠে স্পষ্ট।