আজ ২১ আগস্ট। দিনটি বাংলার চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়ক রাজ্জাকের মৃত্যুবার্ষিকী হিসেবে স্মরণ করা হচ্ছে। ‘নায়করাজ’ উপাধিতে ভূষিত এই শিল্পীর বর্ণাঢ্য জীবনের নানা অধ্যায় আজও দর্শক ও অনুরাগীদের হৃদয়ে জাগরুক। তাঁর পরামর্শ ও পৃষ্ঠপোষকতায় বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র আবারও ঘুরে দাঁড়ায়; বিশেষ করে ‘বাবা কেন চাকর, সন্তান যখন শত্রু’ ছবির রিমেকের মাধ্যমে এই পুনর্জীবনের সূচনা হয়।
১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি অবিভক্ত ভারতের কলকাতার কালীগঞ্জের নাকতলা এলাকায় ৮ নম্বর বাড়িতে তাঁর জন্ম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়ে জন্ম নেওয়া এই শিশুর জীবনও ছিল সংগ্রামময়। পরবর্তীতে সেই সংগ্রামই তাঁকে সাফল্যের শীর্ষে নিয়ে যায়। ১৯৬৪ সালের ২৬ এপ্রিল তিনি ঢাকায় পা রাখেন। এর আগে ১৯৬২ সালে রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। আট মাস বয়সী পুত্র বাপ্পারাজ ও স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে খুলনার শিমুলিয়া হয়ে মাইগ্রেশন করে ঢাকায় আসেন তিনি। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার পর বোম্বেতে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ঢাকাকেই বেছে নেন।
ঢাকায় এসে প্রথমদিকে অভিনয়ের সুযোগ তেমন মেলেনি। পরিচালকের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ‘কাগজের নৌকা’, ‘কাগজের বৌ’ এবং ‘১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগারের লেন’—এই ছবিগুলোতে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। ভালো চরিত্রের জন্য তখনো কেউ তাঁকে ডাকে নি। অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনায়ও হাত দেন রাজ্জাক। তাঁর প্রথম পরিচালিত ছবি ‘অনন্ত প্রেম’। বাংলা ও উর্দু মিলিয়ে তিনি তিন শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে তিন শতাধিক ছবিতে তিনি নায়ক হিসেবে পর্দায় হাজির হন। ষাটের দশকের শেষভাগ থেকে সত্তর ও আশির দশক পর্যন্ত তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করেন।
রাজ্জাকের প্রথম নায়িকা ছিলেন সুচন্দা। ১৯৬৬ সালে মুক্তি পাওয়া জহির রায়হান পরিচালিত ‘বেহুলা’ ছবিটি ব্যবসায়িকভাবে দারুণ সাফল্য পায়। মনে রাখতে হবে, ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পর ভারত থেকে ছবি আমদানি নিষিদ্ধ হয়ে যায়। তখন উত্তম-সুচিত্রা জুটির বিকল্প হিসেবে দর্শক খুঁজছিলেন নতুন জুটিকে। রাজ্জাক-সুচন্দা হয়ে ওঠেন সেই বিকল্প। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘চাঁপা ডাঙ্গার বউ’ সেলুলয়েডের পর্দায় এনে দর্শকের চোখের জল ঝরিয়েছেন রাজ্জাক। ‘অনন্ত প্রেম’ ছবিটিও দর্শকের হৃদয়ে দীর্ঘদিন স্থান করে নেয়। খুরশীদ আলমের গাওয়া অনেক গানে ঠোঁট মিলিয়েছেন তিনি। এই প্রজন্মের তারকা শাকিব খান ও অপু বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ; চলচ্চিত্রের দৃশ্যে অনুজ ফেরদৌস ও প্রয়াত নায়ক মান্নার সঙ্গেও তাঁর উপস্থিতি স্মরণীয়।
জুটিগতভাবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল রাজ্জাক-কবরী জুটি। উত্তম-সুচিত্রার মতো এই জুটির ছবিও ছিল সে সময়ের তরুণদের মাঝে উন্মাদনার কারণ। সুভাষ দত্তের ‘আবির্ভাব’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এই জুটি প্রতিষ্ঠা পায়। পরবর্তীতে ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘দর্পচূর্ণ’, ‘দীপ নেবে নাই’, ‘ময়নামতি’, ‘ক খ গ ঘ ঙ’ ও ‘ঢেউয়ের পরে ঢেউ’—এই ছবিগুলো দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করে। স্বাধীনতার পর ‘রংবাজ’ ও ‘বেইমান’ এই জুটির উল্লেখযোগ্য কাজ।
ববিতার সঙ্গে অসংখ্য হিট রোমান্টিক সিনেমা উপহার দিয়েছেন নায়করাজ। মজার বিষয় হলো, এই নায়িকার বাবা ও মামার চরিত্রেও অভিনয় করেছেন তিনি। ১৯৬৮ সালে ‘সংসার’ ছবিতে রাজ্জাক-সুচন্দা জুটির সঙ্গে ববিতা মেয়ে হিসেবে অভিনয় করেন। জহির রায়হানের পরিচালনায় নির্মিত এই ছবি ছিল তাঁর প্রথম পরিচিতি। পরের বছর ১৯৭০ সালে ‘টাকা আনা পাই’ ছবিতে জহির রায়হান ববিতাকে রাজ্জাকের নায়িকা হিসেবে নিয়ে আসেন। এরপর চাষী নজরুল ইসলামের ‘স্বরলিপি’ ও রাজ্জাকের নিজের পরিচালিত ‘অনন্ত প্রেম’ এই জুটিকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। ‘পিচ ঢালা পথ’, ‘আলোর মিছিল’, ‘বাঁদী থেকে বেগম’, ‘সোহাগ’ ও ‘বিরহ ব্যথা’ এই জুটির স্মরণীয় ছবি।
১৯৬৯ সালে কাজী জহিরের ‘মধু মিলন’ দিয়ে শুরু হয় রাজ্জাক-শাবানা জুটির। ১৯৭২ সালের ‘অবুঝ মন’ ছবিটি দর্শকপ্রিয়তায় নতুন মাত্রা যোগ করে। ‘সাধু শয়তান’, ‘মাটির ঘর’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘চাঁপা ডাঙ্গার বউ’, ‘সখী তুমি কার’, ‘অমর প্রেম’ ও ‘রজনীগন্ধা’—এই ছবিগুলো জুটিটির সাফল্যের সাক্ষ্য বহন করে। রাজ্জাক-সুচন্দা, রাজ্জাক-কবরী, রাজ্জাক-ববিতা ও রাজ্জাক-শাবানা—এই চার জুটির ছবিগুলো দর্শকহৃদয়ে আলোড়ন তুলেছে। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ‘চিত্রালী’ পত্রিকার সম্পাদক আহমদ জামান চৌধুরী তাঁকে ‘নায়করাজ’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
ষাটের দশকে দুর্ঘটনায় পা হারানো রোমান্টিক নায়ক রহমানের শূন্যতা পূরণে রাজ্জাকই ছিলেন প্রথম পছন্দ। আশির দশকে কিছু মানসিক দুশ্চিন্তার কারণে রাজ্জাক একাকিত্ব বেছে নেন। ‘চিত্রালী’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদে তাঁর শিরোনাম ছিল—‘নিঃসঙ্গতাই এখন রাজ্জাকের অসুখ’। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে টালিউডের বাংলা চলচ্চিত্র যখন সংকটের মুখোমুখি, তখনো তিনি পাশে ছিলেন। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলার চলচ্চিত্রাঙ্গনের কিংবদন্তি এই নায়ককে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে সকলে। তাঁর অবদান বাংলার সিনেমার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।




