যুক্তরাজ্যের সড়কে চীনা গাড়ির উপস্থিতি ক্রমশ বেড়েই চলেছে, অথচ কয়েক বছর আগেও এমন দৃশ্য ছিল অকল্পনীয়। বর্তমানে লন্ডনের পথে বিওয়াইডি, গিলির মতো চীনা ব্র্যান্ডের যানবাহন নিয়মিত চোখে পড়ছে। ব্রিটিশ ভোক্তাদের একটি বড় অংশ কম মূল্য, আধুনিক প্রযুক্তি ও নির্মাণশৈলীর কারণে চীনে তৈরি গাড়ির দিকে ঝুঁকছেন। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি। ইউরোপের অন্যতম প্রধান বাজার যুক্তরাজ্য এখন চীনা অটোমোবাইল শিল্পের জন্য একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
অটোমোটিভ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মোবিলিটি গ্লোবালের তথ্য বলছে, ২০১৫ সালে যুক্তরাজ্যের বাজারে চীনা গাড়ি বিক্রি হয়েছিল মাত্র ৩৮৪টি। পাঁচ বছর পর ২০২০ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ হাজার ৩০২-এ। গত বছর বিক্রি ২ লাখ ৮৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ এক দশকের ব্যবধানে এই বাজার প্রায় কয়েক শ গুণ প্রসারিত হয়েছে।
এই পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ইজি উডরো। মাত্র চার সপ্তাহ আগে তিনি একটি চীনা গাড়ি ক্রয় করেছেন। লন্ডনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের শহর মেইডস্টোনের লিপসকম্ব কার্স নামের বিক্রয়কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে তিনি জানান, গাড়িটি চালাতে দারুণ, অত্যন্ত আরামদায়ক এবং সম্পূর্ণ নীরব। গাড়ির নির্মাণ মান ও ফিনিশিং চমৎকার বলে তিনি মন্তব্য করেন। প্রযুক্তিগত সুবিধাগুলোও বেশ ভালো বলে তার অভিমত। চীনের গিলি ব্র্যান্ডের এই বিক্রয়কেন্দ্রটি চালু হয়েছে এক বছরের কম সময় আগে, কিন্তু ইতিমধ্যে ক্রেতাদের থেকে উৎসাহজনক সাড়া মিলেছে।
লিপসকম্ব বর্তমানে গিলির মাত্র দুটি মডেল বিক্রি করছে। তাতেই আকৃষ্ট হয়েছেন ক্রিস ও ট্রেসি স্মিথের মতো অনেক গ্রাহক। ক্রিস স্মিথের মতে, দামের তুলনায় এই গাড়িগুলো অনেক বেশি সুবিধা প্রদান করছে। একই মূল্যে অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডের গাড়ির চেয়ে বেশি ফিচার পাওয়া যাচ্ছে। অথচ অনেক নামী ব্র্যান্ড বেশি দাম নিয়েও কম সুবিধা দিচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
অটোমোটিভ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বেঞ্চমার্কের বিশ্লেষক উইল রবার্টস বলেন, কয়েক বছর আগেও যুক্তরাজ্যে চীনা গাড়ি ছিল কৌতূহলের বিষয়। বর্তমানে এটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রথম যখন লন্ডন ব্রিজে বিওয়াইডির গাড়ি দেখা গিয়েছিল, তখন সেটি বড় খবর ছিল। কিন্তু এখন এগুলো এতটাই সাধারণ হয়ে গেছে যে আলাদাভাবে আর নজরেই পড়ে না।
চীনের গাড়ি রপ্তানি বৃদ্ধির পেছনে অভ্যন্তরীণ বাজারের ধীরগতি প্রধান কারণ। নতুন গাড়ির চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় কোম্পানিগুলো এখন রপ্তানির দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। চায়না অ্যাসোসিয়েশন অব অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে চীনের খুচরা বাজারে গাড়ি বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে গাড়ি রপ্তানি বেড়েছে ৭২ শতাংশ।
ইউরোপজুড়েই চীনা গাড়ির বিক্রি বাড়ছে। তবে যুক্তরাজ্যের বাজার তাদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশটি প্লাগ-ইন হাইব্রিড বৈদ্যুতিক গাড়িতে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেনি, যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন করেছে। উইল রবার্টসের মতে, যুক্তরাজ্যের বাজারে দ্রুত বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রসার হচ্ছে। এটি ইভির দ্রুত সম্প্রসারণশীল বাজারগুলোর একটি। একই সঙ্গে তুলনামূলক কমদামি গাড়ির চাহিদাও রয়েছে। ফলে চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য এটি বড় সুযোগ হিসেবে এসেছে।
দামের দিক থেকেও চীনা ব্র্যান্ডগুলো এগিয়ে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জার্মানিতে তৈরি নতুন ফক্সভাগেন টিগুয়ান প্লাগ-ইন হাইব্রিডের দাম যুক্তরাজ্যে ৪৩ হাজার পাউন্ডের কিছু বেশি। অন্যদিকে চীনে তৈরি বিওয়াইডি সিল ইউয়ের দাম প্রায় ১০ হাজার পাউন্ড কম।
অবশ্য এই প্রতিযোগিতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আপত্তি জানিয়ে আসছে পশ্চিমা গাড়ি কোম্পানিগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘বিগ থ্রি’সহ অনেক প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, চীন সরকারের ভর্তুকির কারণে কোম্পানিগুলো অস্বাভাবিক কম দামে গাড়ি বিক্রি করতে পারছে। তবে সেই অভিযোগ চীনা গাড়ির রপ্তানি বৃদ্ধির গতি কমাতে পারেনি।
জেনারেল মোটরসের (জিএম) সাবেক পরিচালনা পর্ষদের সদস্য জন ম্যাকনিল সিএনবিসিকে বলেন, দাম ও প্রযুক্তি—দুই দিক থেকেই চীনা গাড়িগুলো ইউরোপীয় বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। এসব গাড়ির দাম যেমন প্রতিযোগিতামূলক, তেমনি এসব গাড়িতে এমন প্রযুক্তি আছে, অনেক ইউরোপীয় ব্র্যান্ডের গাড়িতেও যা নেই।
লিপসকম্ব কার্সের পরিবেশক জন পান্ডা-নোয়ার মতে, কম দামের কারণে হয়তো ক্রেতারা বিক্রয়কেন্দ্রে আসেন, তবে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন গাড়ির মান দেখে। ক্রেতারা সামনাসামনি গাড়ি দেখে এর নকশা, নির্মাণের মান ও ফিনিশিং দেখে প্রকৃত অর্থেই মুগ্ধ হয়ে যান বলে তিনি জানান।




