সোমবার আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অশোধিত তেলের মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়া প্রধান কারণ। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গ্রিনিচ মান সময় ২টা ৪১ মিনিটে ব্রেন্ট ক্রুডের সেপ্টেম্বর সরবরাহ চুক্তির দাম ২ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ দশমিক ১৯ ডলারে পৌঁছায়। গত ১১ জুনের পর এটাই সর্বোচ্চ স্তর।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার নির্দেশক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের আগস্ট সরবরাহ চুক্তির দাম ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৪ দশমিক ২০ ডলারে উঠেছে। গত ১২ জুনের পর ডব্লিউটিআই-এর দাম এত বেশি দেখা যায়নি। গত সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআই-এর দাম ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে, যা এপ্রিল মাসের পর কোনো সপ্তাহে দেখা যায়নি।

এই সংকটের মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পূর্বের যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গ করে ইরানে হামলা শুরু করলে ইরানও পাল্টা জবাব দেয়। গত সপ্তাহের শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত আরও তীব্র রূপ নেয়। যুক্তরাষ্ট্র টানা নয় রাত ধরে ইরানে হামলা চালিয়েছে, আর ইরানের মিত্র কুয়েত ও বাহরাইনও নতুন করে হামলার শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছে।

ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণে একটি অনিরাপদ বিকল্প পথ দিয়ে যাওয়ার সময় দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। ট্যাংকার দুটি অচল হয়ে পড়েছে বলে আইআরজিসি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, মার্কিন সামরিক বাহিনী ট্যাংকারগুলোকে ওই পথ ব্যবহার করতে উৎসাহ দিয়েছিল। তবে রয়টার্স স্বাধীনভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরে নৌ অবরোধ আরোপ করেছে, আর ইরান হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নির্ধারিত নিয়ম না মানা জাহাজে হামলা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে।

বাজার বিশ্লেষণকারী সংস্থা আইএনজি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ নেই। এই উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে না এলে পুরো অঞ্চলে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হবে। অন্যদিকে বার্কলেজের বিশ্লেষক অমরপ্রীত সিং এক নোটে উল্লেখ করেছেন, দুই পক্ষের নতুন অবরোধের মধ্যে এই অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি কতটা টেকসই হবে, তা আগামী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করবে। তিনি আরও বলেন, সরবরাহ-সংকটের ঝুঁকি থাকলেও বাজার এখনো সেটাকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না। বর্তমানে বিশ্বে তেলের মজুত গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে নিম্ন স্তরে রয়েছে, যা যুদ্ধ শুরুর সময়ের চেয়েও কম।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে কমে গেছে। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের (এলএসইজি) তথ্য অনুযায়ী, রোববার মাত্র চারটি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে, যা আগের দিন ছিল আটটি। শুক্রবার থেকে পরিশোধিত জ্বালানি বহনকারী অন্তত তিনটি ট্যাংকার ও একটি বৃহৎ জাহাজ তেল বোঝাইয়ের জন্য প্রণালিতে প্রবেশ করেছে। যুক্তরাজ্যের ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, ওমানের কুমজার উপকূলের উত্তর-পশ্চিমে একটি জাহাজে আগুন লেগেছে।

তেলের দাম এইভাবে বাড়তে থাকলে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোয় জ্বালানি সংকট আরও ঘনীভূত হবে। এর আগে গত এপ্রিলে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়ালে অর্থ দিয়েও তেল জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে, এবং বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে জ্বালানি রেশনিং ও লোডশেডিং শুরু হয়েছিল। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরও একই চিত্র দেখা গিয়েছিল। তেলের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি ও ডলার-সংকট তৈরি করে, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিশেষ উদ্বেগের বিষয়।