বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও বাড়তে শুরু করেছে। মঙ্গলবার এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯১ দশমিক শূন্য ৬ ডলারে উঠে যায়, যা গত ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগের দিনেও তেলের দাম ২ ডলারের বেশি বেড়েছিল। এর ফলে চলতি সপ্তাহের শুরুতেই তেলের দর আবারও ৯০ ডলারের ঘর পেরিয়ে যায়।

মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হয়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল দুই দেশের মধ্যে প্রথমে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। পরে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনার ভিত্তিতে ১৭ জুন ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। যদিও উভয় পক্ষই সেই চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে সাময়িক সম্মতি প্রকাশ করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই মেয়াদ আর বাড়ানো হলো না। মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে ইরান জানিয়ে দেয়, তারা 'পূর্ণ আক্রমণাত্মক' অবস্থানে যাবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করতে রাজি হয়নি। ফলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে গেছে।

তেলের বাজারে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের একটি বিশাল অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ইরানের সঙ্গে আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। গত শনিবার এই পথ দিয়ে মাত্র পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ গেছে। পরের দিন রোববার কোনো ট্যাংকারই সেখানে দেখা যায়নি। অথচ তার আগের রোববার ৩১টি ট্যাংকার চলাচল করেছিল। দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রণালিতে অচলাবস্থা বজায় থাকলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ আরও সংকুচিত হয়ে পড়তে পারে। এর পাশাপাশি লোহিত সাগরে হুতিদের হামলার ঘটনাও নতুন করে সরবরাহ ঝুঁকি তৈরি করছে।

তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির আশঙ্কাও মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার বেড়ে ৪ দশমিক ৭২৮ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে ৩০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহার ৫ দশমিক ৩১৫ শতাংশে উঠে প্রায় দুই দশকের রেকর্ড স্পর্শ করেছে। জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে, ফলে নীতি সুদের হার দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে থাকার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে দুর্বলতার কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। জুলাই মাসে দেশটির খুচরা বিক্রি কমেছে এবং শ্রমবাজারের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান প্রত্যাশার চেয়ে অনেক দুর্বল। এ কারণে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমাতে পারে বলে বাজারে যে আশা তৈরি হয়েছিল, তাও স্তিমিত হয়ে এসেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে এবং মূল্যস্ফীতির হার আবারও ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ফলে সুদের হার যে আরও বাড়তে পারে, সেই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বৈশ্বিক তেলবাজার এখন পুরোপুরি হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনৈতিক তৎপরতার দিকে নজর রেখেছে। যুদ্ধবিরতি পুনর্বহাল না হলে সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হয়ে তেলের দাম আবারও ১০০ ডলারের উপরে উঠে যেতে পারে বলে শঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলার। ৩০ এপ্রিল সেই দাম ১২৬ ডলারে পৌঁছেছিল। তবে ২৬ জুন দাম আবার ৭২ ডলারে নেমে আসে এবং এরপর থেকে তা ওঠানামা করছে।