জাতীয় সংসদে বৃহস্পতিবার বেলা দুইটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। এই ভোটে অংশ নিয়েছেন চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একমাত্র সংসদ সদস্য মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ। অথচ একই দিনের দুপুরে দলটি গণমাধ্যমে একটি বিবৃতি পাঠিয়ে জানিয়েছিল, জুলাই সনদের আলোকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় তারা ভোট দেবেন না। কিন্তু বিকেলে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে সংসদ কক্ষে ভোট প্রদান করেন তিনি।
দলটির মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান সন্ধ্যায় মুঠোফোনে জানান, জুলাই সনদে ঐকমত্য হওয়া নীতি অনুসারে নির্বাচন হচ্ছে না দেখে প্রথমে ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে বিএনপির বক্তব্যে তারা আশ্বস্ত হন যে, আগামী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন জুলাই সনদের ভিত্তিতে হবে এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা হবে। এই প্রতিশ্রুতির কারণেই সংসদ সদস্য ভোট দিয়েছেন বলে তিনি ব্যাখ্যা দেন। বিকেল থেকে মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। ফলে তাঁর ব্যক্তিগত মতামত সরাসরি জানা সম্ভব হয়নি।
বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রেরিত বিবৃতিতে ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনকালীন সরকারের সংকটের পেছনে দলীয় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অন্যতম কারণ। এই সংকট নিরসনে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে রাষ্ট্রপতির নির্বাচন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখানে বিএনপির পক্ষ থেকেও কোনো ভিন্নমত ছিল না। জুলাই সনদের ধারা-১০-এ বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি আইনসভার উভয় কক্ষ—উচ্চ ও নিম্নকক্ষ—এর সদস্যদের গোপন ভোটে নির্বাচিত হবেন; এ বিষয়ে বিএনপিও সম্মত ছিল। আবার ধারা-২৮-এ উল্লেখ আছে যে, জাতীয় সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থ বিল ও আস্থা ভোট ব্যতীত অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। এই দুটি বিষয়েও বিএনপিসহ সকল পক্ষ একমত পোষণ করেছিল এবং কোনো বিরোধিতা ছিল না। কিন্তু বর্তমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এই দুই শর্তের কোনোটিই কার্যকর হয়নি বলে ইসলামী আন্দোলন অভিযোগ জানায়।
বিবৃতিতে আরও জোর দিয়ে বলা হয়, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বহাল থাকার ফলে রাষ্ট্রপতি পদে কে নির্বাচিত হবেন, তা পূর্বনির্ধারিত। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের কাজ, সংসদ সদস্যদের ভূমিকা এবং সংসদের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠে। দলটির মতে, এই প্রক্রিয়াকে আদৌ নির্বাচন বলা সম্ভব কিনা এবং এর কোনো বাস্তব প্রয়োজন আছে কিনা, সে বিষয়ে গভীর সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। তারা মনে করে, এটি জনগণের করের টাকা অপচয় এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা হ্রাস করা ছাড়া অন্য কিছু নয়।
ভোটগ্রহণের আগে দুপুরে সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে সংবিধানের সংশোধনী আসলে ৭০ ধারায় পরিবর্তন আসবে। জুলাই জাতীয় সনদে একমত হওয়া পদ্ধতি অনুসারে ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের পর পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সেই নিয়মে অনুষ্ঠিত হবে। তবে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, এখনো সংবিধান সংশোধন হয়নি। ক্ষমতাসীন বিএনপি জোটের ২৫০ এবং বিরোধী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের ৯০ জন সংসদ সদস্য ছাড়াও আটজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ভোটার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তবে স্বতন্ত্র সদস্য রুমিন ফারহানা এবং বিএনপির মির্জা আব্বাস, মোস্তফা কামাল পাশা ও ওসমান ফারুক, খেলাফত মজলিসের আবুল হাসান এবং জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরুল ইসলাম ভোট দেননি।




