ফুটবল খেলা দেখা কেবল একটি বিনোদন নয়, এটি শরীর ও মনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। ২০১৪ সালের ফিফা বিশ্বকাপের সময় চিলির এক ৫৮ বছর বয়সী ভক্ত পেনাল্টি কিক মিস হওয়ার পর তীব্র হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন। আর তার স্ত্রী অতিরিক্ত মানসিক চাপে ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোমে ভোগেন। চিকিৎসকদের মতে, স্বামীর অসুস্থতা দেখে স্ত্রীর হার্টের একটি অংশ সাময়িকভাবে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। যদিও সুস্থ মানুষের জন্য এমন ঘটনা বিরল, তবুও খেলা দেখার সময় শরীরের ভেতরে নানা প্রতিক্রিয়া সক্রিয় হয়।
যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষক ম্যাট বাটলার সম্প্রতি ফুটবল সমর্থকদের মস্তিষ্ক ও আচরণ নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, মাঠে খেলোয়াড়রা যখন সংগ্রাম করে, তখন দর্শকের মন ও শরীরও একইভাবে সাড়া দেয়, যেন তারা নিজেরাই খেলছে। দলের প্রতি আসক্তি যত বেশি, শারীরিক প্রভাবও তত প্রকট। কট্টর সমর্থকেরা প্রিয় দলের জয়-পরাজয়কে নিজের জীবনের অংশ হিসেবে নেয়, যা অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।
২০১২ সালের একটি গবেষণায় স্পেনের ভক্তদের উপর পর্যবেক্ষণ চালানো হয়। সেখানে দেখা যায়, ২০১০ বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচের সময় সমর্থকদের শরীরে কর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষত পুরুষ, তরুণ ও চরম ভক্তদের মধ্যে এই হরমোনের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি ছিল। বিজ্ঞানীরা এর পেছনে 'সামাজিক আত্মরক্ষা'র তত্ত্ব দেন। মানুষের মনের গভীতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতার ইচ্ছা থাকে, যেটি যখন হুমকির মুখে পড়ে, মস্তিষ্ক সেটিকে শারীরিক বিপদ মনে করে। ফলে দ্রুত কর্টিসল নিঃসরণ শুরু হয়, যা মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়।
এই উত্তেজনা কেবল মাঠের ৯০ মিনিটেই সীমাবদ্ধ নয়। জার্মানির এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রিয় দলের খেলা শুরুর ১৪ ঘণ্টা আগে থেকেই সমর্থকদের শরীরে স্ট্রেস হরমোন ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। স্মার্টওয়াচ দিয়ে ১২ সপ্তাহের পর্যবেক্ষণে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
মানসিক চাপের সময় অ্যাড্রেনালিন ও অন্যান্য হরমোন বেড়ে যায়, যা হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বাড়ায়। ফলে হৃৎপিণ্ডের অক্সিজেনের চাহিদা বাড়ে, কিন্তু একই সময়ে হরমোনগুলো রক্তনালী সংকুচিত করে অক্সিজেন সরবরাহ কমিয়ে দেয়। এই ভারসাম্যহীনতার ফলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি তৈরি হয়। ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ দেখার দিনে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গিয়েছিল। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের আর্জেন্টিনার সাথে ম্যাচের দিন ও পরের দুই দিনে ইংল্যান্ডে হার্ট অ্যাটাকে হাসপাতালে ভর্তির হার ২৫ শতাংশ বেড়েছিল। স্পেনের আরেক গবেষণায় পুরুষ ভক্তদের মধ্যে দেখা গেছে, যাদের আগে থেকেই হৃদরোগ ছিল, তাদের প্রিয় দল হেরে যাওয়ার দিনে হৃদরোগের জন্য হাসপাতালে যাওয়ার হার ৩০ শতাংশ বেড়ে যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ঘুমের অভাব। ভিন্ন সময় অঞ্চলে খেলা হলে দর্শকদের রাত জেগে খেলা দেখতে হয়। ২০০২ সালের এশিয়া বিশ্বকাপের সময় যুক্তরাষ্ট্রের দর্শকদের অনেক ম্যাচ ভোরে বা মাঝরাতে দেখতে হয়। গবেষণায় দেখা যায়, জার্মান বংশোদ্ভূত মানুষ বেশি যেসব শহরে ছিল, সেখানে জার্মানির খেলার দিনে গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ৩৫ শতাংশ বেড়ে যায়। যেখানে জার্মানদের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি ছিল, সেখানে এই হার বেড়ে ১২২ শতাংশে পৌঁছায়। পরবর্তী বিশ্বকাপে স্বাভাবিক সময়ে খেলা সম্প্রচারের ফলে দুর্ঘটনার হার কমে যায়। গবেষকরা মনে করেন, মাত্র এক রাতের ঘুমের অভাবই মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নষ্ট করে দিতে পারে।
শুধু ফুটবল নয়, ক্রিকেটসহ অন্যান্য খেলাও দর্শকের শরীরে একই ধরনের প্রভাব ফেলে। তবে ফুটবলে গোলের সংখ্যা কম এবং প্রতিটি গোলের গুরুত্ব বেশি বলে মানসিক চাপ ও উত্তেজনা বেশি হয়। অনিশ্চয়তা ও ভাগ্যের ভূমিকার কারণেও ফুটবলে আবেগের মাত্রা চরমে ওঠে।
গবেষকরা বলেন, খুব বেশি আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সুস্থ মানুষের জন্য ঝুঁকি কম। তবে খেলা দেখার সময় মাথায় রাখা উচিত, এটি শেষ পর্যন্ত একটি খেলা মাত্র।




