চলতি বছর গণিতের সর্বোচ্চ সম্মাননা ফিল্ডস মেডেল জিতেছেন মার্কিন গণিতবিদ জন পারডন। ৪০ বছরের কম বয়সী সেরা গণিতবিদদের জন্য নির্ধারিত এই পুরস্কার পেয়েছেন ৩৭ বছর বয়সী এই টপোলজিস্ট। দড়ির গিঁট ও জ্যামিতির জটিল সমস্যা নিয়ে তাঁর কাজ এ বছর আন্তর্জাতিক গণিত সম্মেলনে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।

পারডনের গণিত যাত্রা শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনায় হাইস্কুলে পড়ার সময়। তখনই তাঁর প্রথম গাণিতিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। বাবার পরামর্শে ইন্টেল সায়েন্স ট্যালেন্ট সার্চের জন্য একটি প্রকল্প করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, চোখে দেখেই জ্যামিতিক সমস্যা সমাধান করতে পারেন। জ্যামিতি ও টপোলজি তাঁর কাছে খুব স্বাভাবিক মনে হতো। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পড়ার সময় আরও গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, যার মধ্যে ছিল তাঁর জীবনের প্রথম বড় সাফল্য।

১৯৮৩ সালে বিখ্যাত রুশ-ফরাসি গণিতবিদ মিখাইল গ্রোমভ একটি জটিল গাণিতিক প্রশ্ন তুলেছিলেন। প্রশ্নটি ছিল জ্যামিতি ও গিঁট নিয়ে। গণিতের ভাষায় গিঁট হলো দড়ির এমন একটি লুপ বা প্যাঁচ, যা দড়িটি না কাটা পর্যন্ত কোনোভাবেই খোলা সম্ভব নয়। গ্রোমভ জানতে চেয়েছিলেন, সব প্যাঁচানো লুপ কি একটি নির্দিষ্ট মাত্রার বাঁকানো অবস্থার মধ্যে আটকে ফেলা যায়? পারডন গাণিতিক হিসাব কষে প্রমাণ করে দেন যে, তা সম্ভব নয়। জ্যামিতি, টপোলজি ও পদার্থবিজ্ঞানের এই সংযোগস্থলে কাজ করেই তিনি গণিতের দুনিয়ায় সাড়া ফেলে দেন।

শুধু গণিতের জগতেই নয়, বাস্তব জীবনেও তিনি কঠিন চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসেন। কলেজে ওঠার পর শুনলেন, মান্দারিন চাইনিজ ভাষা শেখা খুব কঠিন। সেটাকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে তিনি এই ভাষায় রীতিমতো দক্ষ হয়ে উঠলেন। ফিল্ডস মেডেল প্রদান অনুষ্ঠানে দেখানো একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি তাঁর দুই ছেলে আলেকজান্দ্রোস ও আন্দ্রেয়াসকে ঘরের দেয়ালে সাঁটানো চীনা অক্ষর চেনাচ্ছেন। তিনি হাসতে হাসতে জানান, তিনি ছেলেদের সঙ্গে প্রচুর চীনা ভাষায় কথা বলেন, তাদের পড়ে শোনান এবং তাদের দিয়েও পড়ান। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, একবার তাঁর এক ছেলে আরেক ভাইকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘বাবা কি চীনে জন্মেছিল?’

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট করার সময় পারডনের উপদেষ্টা ছিলেন ইয়াকভ এলিয়াশবার্গ। তাঁর মতে, পারডনের সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো নির্দিষ্ট উপপাদ্য প্রমাণ করা নয়, বরং তিনি এমন একজন পণ্ডিত যিনি কোনো গাণিতিক সমস্যার ভেতরের গঠনটা বুঝতে পারেন। এলিয়াশবার্গের ভাষায়, ‘এটাই জনের আসল শক্তি। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সে বারবার এটাই প্রমাণ করে দেখিয়েছে।’ যে মানুষটি এত অনায়াসে দড়ির গিঁট থেকে শুরু করে জীবনের কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর জট খুলতে পারেন, ফিল্ডস মেডেল তাঁর গলাতেই সবচেয়ে বেশি মানায় বলে মন্তব্য করেন গণিতবিদরা।