চলতি বছরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক আকার ধারণ করছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার সকাল আটটা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল আটটা পর্যন্ত) দেশে এডিস মশাবাহিত এই রোগে তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে, যার ফলে টানা ছয় দিন ধরে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলো। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা ছিল ১৮ জন, যেখানে জুলাই মাসের মাত্র ৩০ দিনে মৃত্যু হয়েছে ৩৫ জনের। জানুয়ারিতে দুই, ফেব্রুয়ারিতে দুই, মে মাসে একজন এবং জুন মাসে ১৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন। মার্চ ও এপ্রিল মাসে কোনো মৃত্যু রেকর্ড করা হয়নি। সংক্রমণের হারেও নাটকীয় বৃদ্ধি দেখা গেছে। প্রথম ছয় মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন ৬ হাজার ১০৪ জন, অথচ জুলাই মাসেই এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৫৩ জনে। এ পর্যন্ত চলতি বছরে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১৫ হাজার ১৫৩ এবং মৃতের সংখ্যা ৫৩ জনে পৌঁছেছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে দুইজন এবং খুলনা বিভাগে একজন ডেঙ্গুতে মারা গেছেন, একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৬৩ জন রোগী।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও কীটতত্ত্ববিদদের মতে, ডেঙ্গুর মূল মৌসুম ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে এবং আগামী আগস্ট থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত সংক্রমণের মাত্রা আরও বাড়তে পারে। সাধারণত সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকে, কিন্তু চলতি মাসের বৃষ্টিপাত এবং সরকারি উদাসীনতার কারণে এবার তা অক্টোবর পর্যন্ত গড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্যবিদ বে-নজির আহমেদ প্রথম আলোকে জানান, জুলাই মাসে এত মৃত্যু ও সংক্রমণ প্রমাণ করে যে রোগ প্রতিরোধে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তিনি সতর্ক করে বলেন, এখনই যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও নাজুক হবে।

কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবীরুল বাশার প্রথম আলোকে বলেন, বড় বৃষ্টির অন্তত দুই মাস পর মশার বংশবৃদ্ধি শুরু হয়, তাই অক্টোবর মাস পর্যন্ত সংক্রমণ অব্যাহত থাকতে পারে, যা বড় শঙ্কার বিষয়। চলতি মাসের ৫ তারিখ থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক বৃষ্টি হয়েছে এবং সম্প্রতি তা আবার বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে নতুন সেরোটাইপের প্রাধান্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ (ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪) রয়েছে। একবার কোনো ব্যক্তি একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে অন্য সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর আক্রান্তদের মধ্যে ডেন-৩ সেরোটাইপের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানী মোহাম্মদ শফিউল আলম প্রথম আলোকে জানান, ২০২৩ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত ডেন-২ সেরোটাইপের প্রাধান্য ছিল, এবার তাই ডেন-৩ প্রাধান্য পেতে পারে।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ছাড়া চলতি বছর সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বরিশাল বিভাগে রেকর্ড করা হয়েছে, গত বছর বরগুনা জেলায় সর্বোচ্চ রোগী ছিল। অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ মনে করেন, ঢাকার বাইরে ব্যাপক সংক্রমণ মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। নতুন সেরোটাইপের বিস্তারের কারণে এবারের ঝুঁকি আরও বেশি। তিনি বলেন, এই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায় হলো মশার বংশবৃদ্ধি রোধ করা, কিন্তু এখন পর্যন্ত রাজধানী বা এর বাইরে কোথাও ইতিবাচক কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।