উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে সফর মাসের শেষ বুধবার 'আখেরি চাহার শোম্বা' নামে পরিচিত একটি দিন পালনের প্রচলন রয়েছে। ফারসি ভাষায় 'আখেরি' অর্থ শেষ এবং 'চাহার শোম্বা' অর্থ বুধবার। লোকমুখে প্রচলিত ধারণা, এই দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর শেষ অসুস্থতার সময় কিছুটা সুস্থতা অনুভব করেছিলেন। সেই স্মৃতিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অঞ্চলে গোসল, নফল নামাজ, রোজা, দান-সদকা এবং বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়। কোথাও কোথাও দিনটিকে আনন্দের উপলক্ষ হিসেবেও উদযাপন করা হয়ে থাকে।
তবে ইসলামি আইনবিদরা বলছেন, কোনো বিষয়ের বৈধতা নির্ধারণে সমাজে প্রচলিত রীতিনীতি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কোরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট নির্দেশনা। রাসুলের জীবনের শেষ অসুস্থতা ছিল উম্মতের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি অধ্যায়। সেই কঠিন সময়েও তিনি নামাজের গুরুত্ব, জামাতে অংশগ্রহণ এবং উম্মতের কল্যাণে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়ে গেছেন, যা সহিহ বুখারির হাদিসে (৬৬৪) বর্ণিত হয়েছে।
প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, সফর মাসের শেষ বুধবার তিনি সুস্থতা বোধ করেন এবং গোসল করেন, যাতে সাহাবিরা আনন্দিত হয়েছিলেন। কিন্তু এই দিনটিকে বিশেষ সুস্থতার দিন হিসেবে চিহ্নিত করে আলাদা ধর্মীয় রীতি চালু করার পক্ষে বিশুদ্ধ কোনো বর্ণনা নেই। ইসলামি ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, ইবাদতের ক্ষেত্রে শরিয়তের দলিল অপরিহার্য। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল যে ইবাদত যেভাবে নির্ধারণ করেছেন, তা সেভাবেই পালন করা আবশ্যক। কোনো সাধারণ নেক আমলকে নির্দিষ্ট দিন, পদ্ধতি বা ফজিলতের সাথে যুক্ত করে ধর্মীয় রীতি বানাতে হলে তার পক্ষে অবশ্যই প্রামাণ্য দলিল থাকতে হবে। ইবনে তাইমিয়া তাঁর মাজমু আল-ফাতাওয়ায় (২৯/১৩) এই নীতির ওপর জোর দিয়েছেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আমাদের এই ধর্মে এমন কিছু নতুন বিষয় প্রবর্তন করল, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।' (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৬৯৭)। তাই আখেরি চাহার শোম্বার জন্য নির্দিষ্ট রাকাত, আলাদা সুরা, বিশেষ দোয়া বা রোজাকে শরিয়তস্বীকৃত আমল হিসেবে গণ্য করার কোনো সুযোগ নেই।
নবীপ্রেমের প্রকৃত প্রকাশ তাঁর সুন্নাহকে জীবনে বাস্তবায়ন করার মাধ্যমেই সম্ভব। রাসুলের ভালোবাসা দাবি করলে তাঁর সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, দয়া ও ইবাদতের প্রতি অনুরাগকে নিজের চরিত্রে প্রতিফলিত করতে হবে। সুনানে তিরমিজির হাদিসে (১৭৫) এসেছে, 'যে আমার সুন্নাহকে ভালোবাসে, সে আমাকে ভালোবাসে। আর যে আমাকে ভালোবাসে, সে জান্নাতে আমার সান্নিধ্যে থাকবে।'
সুতরাং আখেরি চাহার শোম্বা নিয়ে মুসলমানদের অবস্থান হওয়া উচিত প্রজ্ঞা ও প্রমাণের ভিত্তিতে। নবীজির স্মৃতি হৃদয়ে অমলিন থাকুক, কিন্তু তাঁর প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর প্রমাণ হোক তাঁর সুন্নতের অনুসরণ।




