বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিতর্ক প্রায়ই মডেলকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে— কোনটি দ্রুততর, কোনটি সক্ষম, কোনটি সাশ্রয়ী। চীনের ডিপসিক, জেডএআই ও মুনশটের মতো কম খরচের সিস্টেমের সাফল্য এই ধারণা দিতে পারে যে মার্কিন নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব কমছে। কিন্তু এই সব বুদ্ধিদীপ্ত, সুলভ মডেলের উত্থান একটি মৌলিক সত্যকে আড়াল করে দেয়: যতদিন যুক্তরাষ্ট্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাস্তুসংস্থানকে সক্রিয় করে এমন অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখবে, ততদিন তার আধিপত্য অটুট থাকবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড়কে বিভিন্ন মডেলের মধ্যে প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা প্রলোভনকর হলেও, অত্যাধুনিক এআই নির্ভর করে আরও অনেক বিস্তৃত, পুঁজি-নিবিড় ব্যবস্থার ওপর: হাইপারস্কেল ডাটা সেন্টার, ক্লাউড কম্পিউটিং পরিকাঠামো, এআই সার্ভার এবং সেগুলোকে সংযোগকারী সমুদ্রের নিচের ফাইবার-অপ্টিক কেবল। বর্তমানে, এই সক্রিয় হার্ডওয়্যারের স্তরগুলো যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, আন্তঃরাষ্ট্রীয় তথ্য উত্তোলন আইন এবং বিশাল বাণিজ্যিক-সামরিক সংশ্লেষণের প্রভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল।

যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের চাবিকাঠি হলো এনভিডিয়ার ব্যবসায়িক মডেল। বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানিটি তার শক্তি অর্জন করেছে গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (জিপিউ) থেকে, যার মাধ্যমে অত্যাধুনিক এআই মডেল প্রশিক্ষিত হয় এবং যার বৈশ্বিক বাজারের প্রায় ৮৫%ই নিয়ন্ত্রণ করে। এনভিডিয়ার এই বাস্তুসংস্থান ব্রডকমের মতো হার্ডওয়্যার নির্মাতা থেকে শুরু করে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস, গুগল ক্লাউড ও মাইক্রোসফট অ্যাজুরের মতো ক্লাউড হাইপারস্কেলার পর্যন্ত বিস্তৃত, যা অ্যানথ্রপিক, ওপেনএআই, মেটা ও অ্যালফাবেটের মতো ফাউন্ডেশনাল ডেভেলপারদের পরিকাঠামো দেয়। এনভিডিয়ার সফটওয়্যার স্তর, কুডা, সবকিছুকে একসূত্রে বেঁধে রাখে।

এই প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর মিশ্রণ বাস্তবে একটি নতুন মার্কিন এআই শিল্প-কমপ্লেক্সের কেন্দ্রস্থল, যারা বড় বড় বাঁধাই চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকান প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে বিস্তৃত সম্পর্ক রাখে। প্রতিরক্ষা দপ্তর গুগল, ওপেনএআই, মাইক্রোসফট, এনভিডিয়াসহ বড় সরবরাহকারীদের গোপনীয় সামরিক নেটওয়ার্কে তাদের অত্যাধুনিক এআই টুল ব্যবহারের জন্য চুক্তিবদ্ধ করেছে। ২০২৭ অর্থবছরে পেন্টাগনের বাজেটে স্বয়ংশাসিত যুদ্ধ ও ড্রোন ব্যবস্থার জন্য ৫৪ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রয়েছে। শুরুর দিকে আপত্তি থাকলেও, ওপেনএআই, এক্সএআই ও গুগল পেন্টাগনকে প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত কাজে, যার মধ্যে স্বয়ংশাসিত অস্ত্র ও ব্যাপক নজরদারিও অন্তর্ভুক্ত, 'সবধরনের বৈধ ব্যবহারের' অনুমতি দেওয়ার বাধ্যতামূলক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।

ওয়াশিংটন ও সিলিকন ভ্যালির বাণিজ্যিক-সামরিক সংশ্লেষের মাত্রা প্রায় অবোধ্য। বাজার মূলধনের ভিত্তিতে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি কোম্পানি মূলত এই আমেরিকান প্রযুক্তি কম্পিউজগুলিই। ওয়াশিংটন এআই-তে ব্যযের প্রতিযোগিতা করছে, ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের মতে, শুধু ২০২৬ সালের ফেডারেল এআই চুক্তিতে ৯০.৭ বিলিয়ন ডলারের বিস্ফোরণ ঘটেছে।

আমেরিকান ক্লাউড হাইপারস্কেলারগুলো বিশ্বজুড়ে ডাটা সেন্টারের সক্ষমতা বাড়ালেও, তারা ক্রমবর্ধমানভাবে নিজেদের ব্যক্তিগত সাবমেরিন ফাইবার অপ্টিক নেটওয়ার্ক তৈরি করছে। মেটা ৪০,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিশ্ব-ব্যপী একটি তার তৈরি করবে, যার ব্যয ধরা হয়েছে ১০ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালে সিলিকন ভ্যালি জায়ান্টদের মালিকানাধীন ও পরিচালিত এই তথ্য-পাইপলাইনগুলো ব্যবহারযোগ্য সমুদ্রের নিচের তারের ৭০% হবে। তবু ওয়াশিংটন এই নেটওয়ার্কগুলো কোথায় যাবে এবং কার সংযোগ পাবে, তা নিয়ন্ত্রণের অধিকার বজায় রাখে। ২০২০ সালে, চীনা গুপ্তচরবৃত্তির উদ্বেগে মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্যাসিফিক লাইট কেবল নেটওয়ার্কের হংকং অংশটি অবরুদ্ধ করে, ফলে প্রায় ১৩,০০০ কিলোমিটার স্থাপিত তার মহাসাগরের তলদেশে ফেলে দেওয়া হয়।

হাইপারস্কেলারগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আন্তঃরাষ্ট্রীয় তথ্যসংক্রান্ত আইনেরও আওতায় ভঙ্গুর। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন ক্লাউড অ্যাক্ট মাথাসহ ক্লাউড সরবরাহকারীকে তাদের দখলে থাকা তথ্য তৈরি করতে বাধ্য করে, এমনকি তা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে সংরক্ষিত থাকলেও। কর্তৃপক্ষ শুধু সংরক্ষিত তথ্যিই নয়, বরং ব্যবহারকারীদের প্রম্পট, মডেলের উত্তর, কে সিস্টেম ব্যবহার করেছিল, কখন ও কোথায় থেকে অ্যাক্সেস করা হয়েছিল, এবং প্রযুক্তিগত আচরণের রেকর্ড সংগ্রহ করতে পারে।

এশিয়ার নির্মাতারা, যেমন টিএসএমসি, এসকে হাইনিক্স ও স্যামসং, সেমিকন্ডাক্টর, এআই সার্ভার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ তৈরি করে। এনভিডিয়ার সরবরাহ চেইন চলে তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মাধমে। সম্প্রতি, এনভিডিয়া প্রধান জেনসেন হুয়াং তাইওয়ানে টিএসএমসির কাছে উন্নত চিপ ও প্যাকেজিং এবং কোয়ান্টা কম্পিউটারসহ অন্যদের কাছ থেকে সারভার ও নেটওয়ার্কিং হার্ডওয়্যার অর্ডার করেছেন। দক্ষিণ কোরিয়ায়, তিনি মেমোরি-চিপ নির্মাতা এসকে হাইনিক্স ও স্যামসঙের সঙ্গে বিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। তথাপি, তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়া এই অবস্থানকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা কম, কারণ তারা বান্ধব দেশে স্থানান্তরিত মার্কিন প্রযুক্তি কাঠামোর আয় বজায় রাখতে আগ্রহী।

আমরা সম্ভবত একটি মার্কিন-নেতৃত্বাধীনা এবং একটি চীন-নেতৃত্বাধীন প্রতিযোগী এআই বাস্তসংস্থানের সৃষ্টি দেখতে পাব, যার অর্থ ভিন্ন মান, পরিকাঠামো ও পরিচালনা পদ্ধতি। কিন্তু ততক্ষণ পর্যন্ত, এটি হবে যুক্তরাষ্ট্র, যারা বৃহত্তর এআই জগতের ওপর শক্ত হাত রাখবে।