দেশের চলচ্চিত্র প্রদর্শনী খাত আরও সংকুচিত হলো। গত বৃহস্পতিবার একই দিনে বন্ধ হয়ে গেছে দুটি স্বনামধন্য প্রেক্ষাগৃহ: কিশোরগঞ্জের ভৈরবের ‘মধুমতি’ সিনেমা হল এবং রংপুরের ‘শাপলা টকিজ’। শুধু প্রদর্শনী বন্ধই নয়, মধুমতি হল ভেঙে ফেলার কাজও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

ভৈরব অঞ্চলে একসময় চারটি সিনেমা হল থাকলেও ‘মধুমতি’ ও ‘দর্শন’ ছিল সর্বশেষ টিকে থাকা দুটি। মেঘনা নদীর তীরবর্তী ‘ছবিঘর’ এবং রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন ‘পলাশ’ হল দুটি অনেক আগেই বন্ধ হয়। ‘ছবিঘর’-এর জায়গায় এখন শপিং সেন্টার এবং ‘পলাশ’-এর স্থলে গড়ে উঠেছে আবাসিক ভবন ও কিন্ডারগার্টেন। হল কতৃপক্ষ জানান, টানা লোকসানের চাপ ও বকেয়া দেনার কারণে সিনেমা হলটি আর চালানো সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে গত দুই ঈদ মৌসুমেও প্রত্যাশিত দর্শক টানতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে ভাঙার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শেষবারের মতো এখানে প্রদর্শিত সিনেমা ছিল সাইফ চন্দন পরিচালিত ‘মালিক’।

অপরদিকে, ১৯৭৮ সালে যাত্রা শুরু করা রংপুরের ‘শাপলা টকিজ’ বন্ধের পেছনের গল্প ভিন্ন। ভাড়ায় পরিচালিত এই সিনেমা হলটির ২০৩২ সাল পর্যন্ত চুক্তি থাকলেও মালিকপক্ষের সিদ্ধান্তের মুখে থেমে গেছে প্রদর্শনী। মূল মালিক, যিনি ছিলেন একজন সেনা সদস্য, ২০০৭ সালে নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান। পরবর্তী উত্তরাধিকারীরা হলটি চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণে আগ্রহী হওয়ায় এটি বন্ধের শিকার হয়। ২১ বছর ধরে হলটি পরিচালনা করা কামাল হোসেন অভিযোগ করেছেন, পূর্ববর্তী চুক্তি উপেক্ষা করায় তিনি চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।

এই দুই হল বন্ধের খবর সামনে আসতেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নির্মাতা অনন্য মামুন। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ভালো মানের চলচ্চিত্রের অভাবে উত্তরবঙ্গের একমাত্র উন্নত পরিবেশের হলটি চিরতরে হারিয়ে গেল। তিনি চলচ্চিত্র সম্পর্কিত সংগঠনগুলোর নেতৃত্বের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘আমাদের অনেক সংগঠন আর নেতা-কর্মী থাকলেও কীভাবে সিনেমা হল ও সিনেমা টিকবে, সেই ভাবনা কারও নেই। সরকার এসেছে ছয় মাসের বেশি হয়ে গেল, তবুও কোনো নেতা সরকারের সঙ্গে বসে সেক্টরের অসুবিধার কথা বলেননি।’ একই সঙ্গে নতুন একটি সংগঠনের উদ্বোধন উপলক্ষে গরু জবাই করে খাওয়ানোর পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি ধিক্কার জানান।

তবে এই গ্লানির ছবির মাঝেই আশার একটি দিকও দেখা যাচ্ছে। চলচ্চিত্রের ১৯টি সংগঠন একত্রিত হয়ে একটি নতুন প্ল্যাটফর্মের যাত্রা শুরু করেছে। এফবিএফডিসিতে অনুষ্ঠিত এই কমিটির পরিচিতি সভায় সভাপতিত্ব করেন চিত্রনায়ক হেলাল খান এবং সদস্যসচিবের দায়িত্বে আছেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির প্রধান শিবা শানু। কমিটির উপদেষ্টা প্রযোজক খোরশেদ আলম জানিয়েছেন, নতুন এই সংগঠনের প্রধান লক্ষ্যই হবে সিনেমা হল রক্ষা করা। তিনি উল্লেখ করেন, প্রেক্ষাগৃহ আধুনিকায়ন ও নতুন হল নির্মাণের জন্য সরকারের এক হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ প্রণোদনা প্রকল্প আছে, যা দ্রুত বাস্তবায়ন, সেন্ট্রাল সার্ভার ও ই-টিকেটিং চালুর মতো বিষয়েও সংগঠনটি কাজ করার পরিকল্পনা করেছে।