উদ্ভিদবিজ্ঞানের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল, সংকর বা হাইব্রিড ফসলের উন্নত গুণাবলি যেন বংশানুক্রমে টিকে থাকে। সেই স্বপ্ন পূরণের দিকে এক ধাপ এগিয়ে গেলেন চীনের একদল গবেষক। সম্প্রতি তারা এমন একটি হাইব্রিড ধান উদ্ভাবন করেছেন, যার বীজ পরবর্তী প্রজন্মে প্রায় অবিকল একই বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। এই সাফল্যের ফলে কৃষকদের প্রতিমৌসুমে নতুন হাইব্রিড বীজ কেনার প্রয়োজনীয়তা ফুরাবে বলে আশা করা হচ্ছে। চায়না ন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী কেজিয়ান ওয়াংয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণাপত্রটি প্রিপ্রিন্ট সার্ভার বায়োআরকাইভে প্রকাশিত হয়েছে।
হাইব্রিড ভিগর বা সংকর শক্তিই হলো সংস্কর ধানের প্রধান শক্তি। দুই ভিন্ন জাতের মিলনে তৈরি প্রথম প্রজন্মের গাছ ইনব্রিড জাতের তুলনায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি ফলন দেয় এবং প্রতিকূল পরিবেশ ও রোগ সহ্য করতে পারে। কিন্তু এই শক্তি কেবল প্রথম প্রজন্মেই সীমাবদ্ধ। জিনগত পুনর্বিন্যাসের কারণে পরবর্তী প্রজন্মের ফলন ও গুণাবলি আর আগের মত থাকে না। এই কারণেই চাষিকে প্রতি বছর নিয়ন্ত্রিত পরাগায়নের মত জটিল ও ব্যয়বহুল পদ্ধতিতে উৎপাদিত নতুন হাইব্রিড বীজ কিনতে হয়।
এ সমস্যার সমাধান হতে পারে সিনথেটিক অ্যাপোমিক্সিস। এই কৌশলে উদ্ভিদকে জিনগতভাবে পরিবর্তিত করে ক্লোনাল বীজ তৈরি করা হয়, যাতে মাতৃ-উদ্ভিদের হুবহু জিনগত বৈশিষ্ট্য উত্তর পুরুষে স্থানান্তরিত হয়। চীনা বিজ্ঞানীরা প্রথমে ডিম্বাণু তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণকারী জিনগুলোর কার্যক্রম পরিবর্তন করেন। এতে স্বাভাবিক মিয়োসিস বিভাজনের বদলে মাইটোসিসের মতো আচরণ শুরু হয়, ফলে জিনগত গঠন অপরিবর্তিত থাকে। কিন্তু একইসঙ্গে স্বাভাবিক বীজ উৎপাদন নিশ্চিত করাও ছিল জরুরি। এর জন্য তারা ধানের শুক্রাণুকোষে সক্রিয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর “হুয়াশু” শনাক্ত করেন। জিনটির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে তারা দেখেন, নিষেকের পর ভ্রূণের সঠিক বিকাশের পাশাপাশি হাইব্রিডের জিনগত গঠনও অটুট থাকে। এই সমন্বিত প্রযুক্তির মাধ্যমে তারা ৯৯ শতাংশের অধিক ক্লোনাল হাইব্রিড বীজ উৎপাদনে সক্ষম হয়েছেন এবং বীজ ধারণক্ষমতাও প্রায় স্বাভাবিক ছিল।
পূর্বে বিজ্ঞানীরা OsBBM1 বা OsWUS-এর মত জিন ব্যবহার করে নিষেক ছাড়াই ভ্রূণ তৈরির চেষ্টা করলেও, হয় ক্লোনাল বীজের হার কম হতো, নয়তো বীজ উৎপাদন কমে যেত। কারণ এই জিনগুলো উদ্ভিদের বিভিন্ন অঙ্গে সক্রিয় থাকে। তাই গবেষকরা এমন একটি জিন খোঁজেন যা কেবল শুক্রাণুতে সক্রিয়, ডিম্বকোষে নিষ্ক্রিয়, কিন্তু নিষিক্ত কোষে শনাক্ত করা যায়। ৮,৭৯৬টি আরএনএ ডেটাসেট বিশ্লেষণ করে তারা প্রথমে ৭২৯টি শুক্রাণু-নির্দিষ্ট জিন শনাক্ত করেন এবং পরে পাঁচটি সম্ভাব্য জিন চিহ্নিত করেন। নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণে দেখা যায়, একটি জিন সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় আছে। এর নাম রাখা হয় 'হুয়াশু'।
হুয়াশু জিনকে ডিম্বকোষে সক্রিয় করার একটি জিনগত গঠন তৈরি করে চীনের জনপ্রিয় সংকর জাত চুনইয়ো ৮৪-তে প্রয়োগ করা হয়। এতে দেখা যায়, ৩৮টির মধ্যে ১৮টি ডিম্বাশয়ে ভ্রূণসদৃশ গঠন তৈরি হয়েছে। পরবর্তীতে, এই প্রযুক্তিকে মিমে প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে 'Fix8' নামের এক সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করা হয়। ফলাফল ছিল বিস্ময়কর। পাঁচটি স্বতন্ত্র Fix8 লাইনের প্রতিটি গাছই জিনগতভাবে মূল সংকর জাতের অবিকল প্রতিরূপ ছিল। ধারাবাহিকতা যাচাইয়ের জন্য Fix8-এর ৩ নম্বর লাইনটির পরবর্তী প্রজন্মে ৩,০৯০টি গাছের মধ্যে ৩,০৮১টিই ডিপ্লয়েড বা স্বাভাবিক ক্রোমোজোম সংখ্যাবিশিষ্ট ছিল। ক্লোনাল দক্ষতা ছিল বিভিন্ন জাতে যথাক্রমে ৯৯.৭%, ৯৯.৭% ও ৯৯.৮%। বিভিন্ন পরিবেশেও একই ফলাফল পাওয়া গেছে এবং বীজ উৎপাদনের হার প্রায় স্বাভাবিক সংকর জাতের সমান ছিল।
এই আবিষ্কারের প্রধান সাফল্য হলো, অতি উচ্চ মাত্রার ক্লোনাল দক্ষতা এবং প্রায় স্বাভাবিক বীজ উৎপাদনের মতো দুটি পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জিত হয়েছে। গবেষকী দাবি করছেন, এই ব্যবস্থা বাণিজ্যিক বীজের বিশুদ্ধতার মানদণ্ড পূরণ করে, তাই এটি বাণিজ্যিক প্রয়োগের জন্য প্রস্তুত। বাংলাদেশের মোট ধানি জমির প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে হাইব্রিড ধানের চাষ হয় এবং এতে প্রতি মৌসুমে বীজ কিনতে গিয়ে কৃষকদের বড় আর্থিক চাপ তৈরি হয়। ভবিষ্যতে সিনথেটিক অ্যাপোমিক্সিস প্রযুক্তি স্থানীয় জাতগুলোতে ব্যবহার করা সম্ভব হলে কৃষকের এই বোঝা কমবে এবং উন্নত জাতের ধান দ্রুতই ছড়িয়ে পড়বে।
যদিও এই প্রযুক্তি এখনো সম্পূর্ণ নিখুঁত নয়, এবং মাঝে মাঝে টেট্রাপ্লয়েড উদ্ভিদ দেখা যেতে পারে, তবুও হাইব্রিড ধানের জনক ইউয়ান লংপিংয়ের একান্ত স্বপ্ন পূরণে এটি বিশাল এক মাইলফলক। দীর্ঘমেয়াদি মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা ও অনুমোদনের পর এটি যদি সফল হয়, তবে ধান ছাড়াও গম ও ভুট্টাসহ অন্যান্য ফসলের চাষাবাদে এক নতুন যুগের সূচনা হবে বলে গবেষকদের প্রত্যাশা।




