পদার্থবিজ্ঞানের গবেষকদের দৃষ্টি এখনও ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের শিল্পকর্মের দিকে নিবদ্ধ রয়েছে। বিশেষ করে ‘দ্য স্টারি নাইট’ চিত্রকর্মটি নিয়ে তাঁদের আগ্রহের শেষ নেই। সম্প্রতি এই চিত্রকর্মের সাথে টার্বুলেন্স বা অশান্ত প্রবাহের গাণিতিক মডেলের সংযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় টার্বুলেন্স বলতে বোঝায় বাতাসের অস্থিরতা, যখন তার স্বাভাবিক মসৃণ প্রবাহ ব্যাহত হয় এবং দ্রুত দিক ও গতি পরিবর্তন করে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অমীমাংসিত সমস্যা। জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ মৃত্যুশয্যায় বলেছিলেন, তিনি ঈশ্বরের কাছে আপেক্ষিকতা ও টার্বুলেন্স সম্পর্কে জানতে চাইবেন।

ভ্যান গঘ ১৮৮৯ সালে সেন্ট-রেমির একটি মানসিক হাসপাতালে থাকাকালে এই চিত্রকর্মটি এঁকেছিলেন। চিত্রকর্মে দেখা যায় নীল ঘূর্ণায়মান রাতের আকাশ, উজ্জ্বল তারা ও চাঁদ, এবং একটি শান্ত গ্রাম। বিশেষ করে আকাশের ঘূর্ণিগুলো পদার্থবিদ আন্দ্রেই কোলমোগোরভের টার্বুলেন্স তত্ত্বের সাথে মিলে যায়, যা তিনি ১৯৪১ সালে উপস্থাপন করেন—ভ্যান গঘের চিত্রকর্মের ৫২ বছর পর। কোলমোগোরভের মতে, বড় ঘূর্ণি থেকে ছোট ঘূর্ণিতে শক্তি স্থানান্তর একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে ঘটে। ‘দ্য স্টারি নাইট’-এ সেই অনুপাত দেখা যায়।

২০০৮ সালে মেক্সিকোর ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানী হোসে লুইস আরাগন ও তাঁর দল গবেষণা করে দেখান যে ভ্যান গঘের চিত্রকর্মে অস্থিরতা ও ঘূর্ণি প্রাকৃতিক নিয়ম মেনেই সাজানো। ২০২৪ সালে চীনের একদল পদার্থবিজ্ঞানী আরও নিশ্চিত করেন যে ব্রাশ স্ট্রোক ও রঙের সান্দ্রতা বায়ুমণ্ডলীয় টার্বুলেন্সের মতো আচরণ করে। জ্যোতির্পদার্থবিদ অ্যাডাম ফ্র্যাঙ্ক এনবিসি নিউজকে বলেন, ভ্যান গঘ যেন চিত্রকলার ভাষায় পদার্থবিদ্যা লিখেছেন।

এছাড়াও, ভ্যান গঘের ‘সানফ্লাওয়ার্স’-এর মতো অন্যান্য চিত্রকর্মেও হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতির ছাপ পাওয়া যায়। তবে ভ্যান গঘ কখনো পদার্থবিদ্যা পড়েননি। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃতির প্রতি তাঁর গভীর পর্যবেক্ষণই এর কারণ।

ভ্যান গঘের জীবনও ছিল ঘূর্ণির মতো অস্থির। তিনি ১৮৮৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর নিজের কান কেটে ফেলেন। এই ঘটনার পেছনে নানা তত্ত্ব রয়েছে। অনেকের মতে, বন্ধু পল গগাঁর সাথে ঝগড়ার পর তিনি এটি করেন। কেউ কেউ মনে করেন, তাঁর ভাই থিওর বাগদানের খবরে তিনি বিচলিত হয়েছিলেন। গবেষক মার্টিন বেলির মতে, থিওর বিয়ে তাঁকে আর্থিক অনিশ্চয়তার ভয় দেখিয়েছিল। আরেক গবেষক বার্নাডেট মার্ফি দাবি করেন, কানটি তিনি একটি ব্রথেলের যৌনকর্মীকে নয়, বরং অন্য এক তরুণীকে পাঠিয়েছিলেন।

কান কাটার পর ভ্যান গঘ সেন্ট-রেমির স্যানাটোরিয়ামে আশ্রয় নেন। সেখানেই তিনি ‘দ্য স্টারি নাইট’ আঁকেন। তাঁর জীবনের শেষ দশ বছরে তিনি ২১০০-এর বেশি শিল্পকর্ম তৈরি করেন, যার মধ্যে ৮৬০টি তৈলচিত্র, ১৩০০-এর বেশি জলরং ও স্কেচ। তিনি প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মপ্রচারক হিসেবেও কাজ করেছিলেন। কিন্তু মানসিক অবসাদ তাকে গ্রাস করেছিল। ১৮৯০ সালের ২৭ জুলাই তিনি নিজের বুকে গুলি করেন এবং দুই দিন পর ৩৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

তারপরও ‘দ্য স্টারি নাইট’ পদার্থবিদদের মুগ্ধ করে চলেছে। এটি কেবল একটি শিল্পকর্ম নয়, বরং মানব মনের জটিলতা ও প্রকৃতির নিয়মের এক অনন্য মিশ্রণ।