ওপেনএআইয়ের হার্ডওয়্যার বিভাগে যোগ দেওয়ার সময় অ্যাপলের প্রাক্তন প্রকৌশলী ছাং লিউ কেবল অভিজ্ঞতাই নয়, সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন বেশ কিছু সংবেদনশীল তথ্যও। শুক্রবার আদালতে দায়ের করা একটি মামলায় অ্যাপল জানিয়েছে, লিউ তাদের একাধিক অভ্যন্তরীণ ফাইল সার্ভারে প্রবেশের ক্ষমতা রাখতেন, যা তিনি একটি সফটওয়্যার বাগের মাধ্যমে আবিষ্কার করেছিলেন। অ্যাপলের প্রাক্তন সহকর্মী অ্যালিসা পেংয়ের কাছে লিউ লিখেছিলেন, 'লোল, আমি মনে করি আমি স্টোরেজে প্রবেশ করতে পারি, মজার ব্যাপার।' এরপর তিনি সেই সুযোগ ব্যবহার করে বিভিন্ন উপস্থাপনা, হার্ডওয়্যার ডিজাইন, উৎপাদন সংক্রান্ত বিবরণ এবং পরীক্ষার নথি ডাউনলোড করেন—এসবই করছিলেন ওপেনএআইয়ে চাকরি করার সময়।

ওই বাগ আবিষ্কারের পর পেং তাকে সহায়তা করেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। পেং উত্তর দিয়েছিলেন, 'আমি প্রস্তুত,' এবং নিজের ল্যাপটপ থেকে আরও তথ্য সংগ্রহ করতে সহায়তা করেন। কয়েক মাস পর এপ্রিল মাসে পেং নিজেও ওপেনএআইয়ের হার্ডওয়্যার বিভাগে যোগ দেন। এভাবে ওপেনএআইয়ে যোগ দেওয়া মোট ৪০০-এর বেশি প্রাক্তন অ্যাপল কর্মীর তালিকায় নাম ওঠে তার। তাদের আকর্ষণ করেছিল আইফোনের দুই দশকের সাফল্যের পথকে অতিক্রম করতে পারে এমন নতুন প্রজন্মের ডিভাইস তৈরির সুযোগ এবং অ্যাপলের চেয়ে বেশি বেতন ও স্টক অপশন।

অ্যাপলের অভিযোগ, এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে ওপেনএআই তাদের গোপন তথ্যের 'অবৈধ নির্ভরশীলতা' তৈরি করছে। ৪০ পৃষ্ঠার এই মামলায় বলা হয়েছে, ওপেনএআই চাকরি প্রার্থীদের ইন্টারভিউয়ের আগে গোপন তথ্য পড়তে উৎসাহিত করত এবং সাক্ষাৎকারের সময় হার্ডওয়্যার যন্ত্রাংশ ও প্রোটোটাইপ নিয়ে আসতে বলত। ওপেনএআইয়ের মুখপাত্র জানান, 'অন্যান্য কোম্পানির গোপন তথ্যে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। আমরা সবার জন্য ক্ষমতায়নকারী প্রযুক্তি তৈরিতেই মনোযোগী।'

মামলাটি দায়ের করা হয়েছে অ্যাপল ও ওপেনএআইয়ের মধ্যে উত্তেজনা চলাকালে। দুই কোম্পানি এখন এআই ডিভাইস বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বী। এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রাক্তন অ্যাপল নির্বাহী ট্যাং ট্যান, যিনি আইফোন ও অ্যাপল ওয়াচের ডিজাইন তদারক করতেন। ২০২৩ সালের শেষে তিনি অ্যাপল ছেড়ে ওপেনএআইয়ের প্রধান হার্ডওয়্যার কর্মকর্তা হন। অ্যাপল তাকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাকার অনুমতি দেয়। তবে পর্দার আড়ালে তিনি ইতিমধ্যে জোনি আইভ ও স্যাম অল্টম্যানের সঙ্গে একটি উচ্চাভিলাষী হার্ডওয়্যার প্রকল্পে কাজ শুরু করেছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল একটি এআই ডিভাইস তৈরি করা যা আইফোনকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। ট্যান এবং আইভ মিলে আইও প্রোডাক্টস প্রতিষ্ঠা করেন, যা ওপেনএআই ৬.৫ বিলিয়ন ডলারে কিনে নেয়।

অ্যাপলের উদ্বেগ আরও বাড়ে যখন ওপেনএআই তাদের ইঞ্জিনিয়ারিং দল থেকে জ্যেষ্ঠ কর্মীদের নিতে থাকে। সর্বশেষ জুন মাসে অ্যাপলের স্মার্ট গ্লাস প্রধান পল মিডকে ওপেনএআই লোভ দেখিয়ে নেয়। অ্যাপলের মতে, ওপেনএআইয়ের এই নিয়োগ প্রচেষ্টা আসলে অ্যাপলের পণ্য উন্নয়ন মেশিনকে প্রতিলিপি করার অপচেষ্টা। মামলায় বলা হয়েছে, 'ওপেনএআইয়ের হার্ডওয়্যার ব্যবসা সবচেয়ে দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা গোপন তথ্যের অবৈধ ব্যবহারে কলুষিত।'

ট্যান অ্যাপলে ২৫ বছর কাজ করে ঝুঁকি নেওয়ার জন্য পরিচিত ছিলেন। তিনি আইফোনের ডিজাইন দলের নেতৃত্ব দেন এবং অ্যাপল ওয়াচের নকশায়ও কাজ করেন। তবে জন টার্নাসের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল টানাপোড়েন। টার্নাস, যিনি অ্যাপলের আসন্ন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, তার হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকেই অধিকাংশ কর্মী ওপেনএআইতে চলে গেছে। মামলায় অভিযোগ, ট্যান ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে অ্যাপলের আসন্ন পণ্য সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতেন। এক ঘটনায়, একজন কর্মী নিজের প্রকল্প সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই ট্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বসেন। সেখানে ট্যান সেই প্রকল্প সম্পর্কে আরও তথ্য চান। এছাড়া, নতুন কর্মীদের অ্যাপল ছাড়ার আগে ব্যক্তিগত ইমেলে তথ্য পাঠাতে উৎসাহিত করা হয় বলে অভিযোগ।

ওপেনএআই এরই মধ্যে হার্ডওয়্যারে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং প্রাথমিক পাবলিক অফারিংয়ের দিকে এগোচ্ছে। তবে মামলার সময় কোম্পানির কাছে কনসেপ্ট ও প্রাথমিক প্রোটোটাইপ ছাড়া তেমন কিছু ছিল না বলে জানা গেছে। বর্তমানে ওপেনএআই একটি এআই-চালিত স্মার্টফোন রিপ্লেসমেন্ট নিয়ে কাজ করছে, যদিও প্রথম পণ্য আরও সরল কিছু হতে পারে। অ্যাপলও হোম ডিভাইস, ক্যামেরা-সজ্জিত এয়ারপডস এবং গ্লাসেস নিয়ে কাজ করছে। অ্যাপলের দাবি, তারা ফেব্রুয়ারিতে ওপেনএআইকে বিষয়টি জানালেও তারা কোনো সাড়া পায়নি। মামলায় উল্লিখিত ট্যানসহ গুরুত্বপূর্ণ ওপেনএআই কর্মীরা কোনো মন্তব্য করেননি।