রাজশাহী নগরের বোয়ালিয়া মডেল থানার সামনের সরু সড়কটি দুপুরের পর থেকেই মানুষের ব্যস্ততায় প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। রিকশা থেকে নামছেন কেউ, কেউ আবার অটোরিকশা থামিয়ে খাবারের খোঁজ করছেন। শিক্ষার্থী, শ্রমিক, চাকরিজীবী থেকে শুরু করে রিকশাচালক—সব পেশার মানুষের ভিড়ে বারবার উচ্চারিত হচ্ছে একটি নাম—‘গোলাপ মামা’। খুলনার কয়রা উপজেলার বাসিন্দা মো. গোলাপ সরদারের (৪৮) এই পরিচিতি এখন রাজশাহীতে তাঁর নিজের। একসময় প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় স্ত্রীকে গ্রামে রেখে ট্রেনে চেপে এই শহরে এসেছিলেন তিনি। পরিচিত কেউ ছিল না এখানে। অন্যের হোটেলে কর্মচারী হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। আজ তাঁর নিজের হোটেলেই কাজ করছেন ৩০ থেকে ৩৫ জন, যাদের মধ্যে সাতজন নারী। প্রতিদিন কয়েক শত মানুষ তাঁর হোটেলের খাবার খান।
১৯৮৮ সালের বন্যার পর থেকেই অভাবের সঙ্গে লড়াই শুরু গোলাপ সরদারের। ১৯৯০ সালে মোংলা বন্দরে এক চাচার হোটেলে কাজে যোগ দেন। কিছুদিন পর নিজেই ব্যবসায় নামেন। তবে একাধিকবার লোকসানে পড়ে ব্যবসা গুটাতে হয়। ২০০৩ সালে ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬০ হাজার টাকায়। তিনি বলেন, ‘তখন ৬০ হাজার টাকা ছিল বিশাল অঙ্কের। ব্যবসা শেষ হয়ে গিয়েছিল। নতুন বউকে বাড়িতে রেখে ভাবলাম, এভাবে আর না। ট্রেনে উঠে রাজশাহী চলে এলাম।’ ২০০৪ সালে শহরে এসে প্রথম আশ্রয় নেন রেলস্টেশনে। টানা ছয় রাত কেটেছিল সেখানেই। পরে স্টেশনসংলগ্ন এক হোটেলে কাজ পান। ধীরে ধীরে কাজ করতে করতে রাজশাহীর প্রতি মমত্ববোধ তৈরি হয়। গোলাপ সরদারের ভাষায়, ‘রাজশাহীতে এসে মনে হলো, মায়ের কোলে ফিরে এসেছি। এত শান্ত পরিবেশ! তখনই ঠিক করি, পরিবারকে এখানেই নিয়ে আসব।’
অন্যের হোটেলে কাজ করার সময় ক্রেতাদের সঙ্গে আন্তরিক আচরণ করতেন তিনি। বিশেষত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গড়ে ওঠে গভীর সখ্য। একসময় শিক্ষার্থীরাই তাঁকে ‘গোলাপ মামা’ বলে ডাকা শুরু করে। এই ডাকটাই পরে তাঁর পরিচয় হয়ে ওঠে। ২০১৫ সালে কর্মস্থলে এক ঘটনার পর নিজের ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। সেবছর মাসে পাঁচ হাজার টাকা ভাড়ায় একটি ছোট দোকান নেন। পুঁজি ছিল মাত্র ১৫ হাজার টাকা। ঈদের সময় আশপাশের দোকান বন্ধ থাকায় এবং পাশে রথের মেলা চলায় প্রথম দিন থেকেই ভালো বিক্রি হয়। এরপর ক্রেতাদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে। সেই ছোট দোকান এখন বড় খাবারের হোটেলে রূপ নিয়েছে। কর্মীদের বেতন বাবদ প্রতিদিন খরচ হয় প্রায় ১৯ হাজার টাকা। দোকানের ভাড়াও ৫ হাজার থেকে বেড়ে এখন ৫০ হাজার টাকার বেশি। তবে ব্যবসার প্রসারের চেয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকেই বড় অর্জন মনে করেন গোলাপ সরদার। তিনি বলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ, এখানে অনেক পরিবারের রুজির ব্যবস্থা হচ্ছে। আমি নিজেও একসময় কর্মচারী ছিলাম, তাই তাদের ভালো আচরণ করি।’
কম দামে খাবার এই হোটেলের আরেকটি বৈশিষ্ট্য। এখনো ২০ টাকায় পাওয়া যায় এক প্লেট খিচুড়ি। দুপুরের খাবারে ডাল দেওয়া হয় বিনা মূল্যে। প্রায় ৩০ পদের খাবার থাকে হোটেলে। ৪০ টাকার মধ্যে ভাত, ভাজি, ভর্তা ও ডাল দিয়ে পেট ভরে খাওয়া যায়। সকাল সাতটা থেকে রাত দুইটা পর্যন্ত চলে রান্না ও বিক্রি। তবে দুপুরে ভিড় সবচেয়ে বেশি। নিম্ন আয়ের মানুষের বড় অংশ নিয়মিত এখানে খান। রিকশাচালক মো. আনোয়ার হোসেন ছয় বছর ধরে এখানে খাচ্ছেন। তাঁর মতে, ‘গরিব মানুষের জন্য কম দামে ভালো খাবার ও বসার ব্যবস্থা থাকাটা বড় কথা।’ চার বছর ধরে নিয়মিত খেতে আসা শিক্ষার্থী শাম্মী আক্তার বলেন, ‘গোলাপ মামা মানুষ হিসেবে ভালো, তাঁর খাবারও ভালো।’
শিক্ষার্থীদের প্রতি গোলাপ সরদারের আলাদা টান। তিনি নিজে পড়াশোনা করতে পারেননি, তাই শহরে পড়তে আসা অসহায় শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর সহানুভূতি বেশি। তিনি বলেন, ‘কারও কাছে টাকা না থাকলে খেয়ে চলে যায়, আমি কিছু বলি না। মনে হয়, তাদের পাশে দাঁড়াতে পারলে আল্লাহও আমার পাশে থাকবেন।’ এই সম্পর্ক শুধু খাবারের টেবিলেই সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর হোটেলে খেতে আসা অনেক শিক্ষার্থী এখন দেশের নানা প্রান্তে চাকরি করেন। রাজশাহীতে এলে কেউ কেউ পরিবার নিয়ে গোলাপ মামার সঙ্গে দেখা করতে আসেন, খোঁজখবর নেন, একসঙ্গে খেতে বসেন। দশ বছর ধরে তাঁর সঙ্গে কাজ করছেন মো. বাচ্চু। তিনি বলেন, ‘গোলাপ ভাইও একসময় কর্মচারী ছিলেন, তাই আমাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন। প্রতিদিনের বেতন প্রতিদিনই দেন।’
রাজশাহীতে এখন নিজের বাড়ি হয়েছে গোলাপ সরদারের। বড় ছেলে রাজশাহী কলেজে অনার্সে পড়ছেন, ছোট ছেলে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে ব্যবসা করার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। সাফল্যের গল্পে তিনি বলেন, ‘ব্যবসা করতে হলে মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়। লাভ একটু কম হলেও মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে হয়। একসময় অন্যের হোটেলে কাজ করতাম, আজ এত মানুষ আমার সঙ্গে কাজ করেন। যা চেয়েছি, আল্লাহ তার চেয়েও বেশি দিয়েছেন।’ খুলনার গ্রামের বাড়িতে এখন সহজে যাওয়া হয় না তাঁর। তবে কোনো নিকটাত্মীয় মারা গেলে ব্যবসার হিসাব মাথায় থাকে না। ছুটে যান সেখানে। কিন্তু বেশি দিন থাকতে পারেন না, আবার ফিরে আসেন রাজশাহীর টানে।




