জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬-এর খসড়া সংসদে পাস হলে প্রতিষ্ঠানটি তার স্বাধীন চরিত্র হারিয়ে সরকারের অনুগত একটি সংস্থায় পরিণত হতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’। রোববার (১৬ আগস্ট) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংগঠনটি এই আশঙ্কার কথা জানায়।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, গত ১০ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়া এই খসড়া আইনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্যারিস নীতিমালার মূলনীতিগুলো প্রতিফলিত হয়নি। ‘অধিকার’ মনে করছে, প্রস্তাবিত আইনটি কার্যকর হলে মানবাধিকার কমিশন তার অতীতের মতোই সরকারের নির্দেশ মেনে চলা একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ নেবে।
সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সরকারের আজ্ঞাবহ সংস্থা হিসেবে কাজ করেছে। সেই সময়ে বিরোধী দলের নেতা-কর্মী, ভিন্নমত পোষণকারী এবং সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, গণগ্রেপ্তার ও নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটলেও কমিশন নীরব ছিল বলেও অভিযোগ তুলেছে তারা।
গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার প্যারিস নীতিমালা অনুযায়ী একটি শক্তিশালী কমিশন গঠনের জন্য গত বছর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ জারি করেছিল। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার সেই অধ্যাদেশটি সংসদে বিল আকারে উপস্থাপন না করায় সেটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে বাতিল হয়ে যায়। নতুন খসড়া আইনে সেই অধ্যাদেশের চেয়েও কমিশনের ক্ষমতা আরও সীমিত করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে মনে করছে ‘অধিকার’।
খসড়া আইনের ১৯ ধারা সম্পর্কে সংগঠনটি জানিয়েছে, এই ধারা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা তাদের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে কমিশন নিজ উদ্যোগে সরাসরি তদন্ত শুরু করতে পারবে না। এর ফলে ভবিষ্যতে তদন্ত প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ না থাকার এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দায়মুক্তি পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিশনের সদস্য নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি আধিপত্যের বিষয়টিও তুলে ধরেছে সংগঠনটি। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্যারিস নীতিমালা অনুযায়ী সদস্য নিয়োগে সমাজের বিভিন্ন অংশের বহুত্ববাদী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু ২০২৬ সালের খসড়া আইনে প্রস্তাবিত ৯ সদস্যের বাছাই কমিটিতে জাতীয় সংসদের স্পিকার, সরকারের দুজন মন্ত্রী, সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। বাকি চারজনের মধ্যে দুজনকে রাষ্ট্রপতি এবং একজনকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন মনোনীত করবেন। অর্থাৎ এই কমিটির ৯ সদস্যের মধ্যে ৮ জনই সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়ছেন, যা কমিশনের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে বলে দাবি করেছে ‘অধিকার’।
এছাড়া বাছাই কমিটিতে নারীদের জন্য আলাদা কোনো আসন না রাখাকেও বৈষম্যমূলক আখ্যা দিয়েছে সংগঠনটি। তাদের মতে, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের তুলনায় নতুন খসড়ায় আনা পরিবর্তনগুলো স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার জনগণের প্রত্যাশা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে এসব পরিবর্তন প্যারিস নীতিমালার পরিপন্থী বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
‘অধিকার’-এর পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়েছে, খসড়া আইনের এসব ত্রুটি সংশোধন করে প্যারিস নীতিমালার আলোকে একটি প্রকৃত স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন প্রণয়ন করতে হবে। তবেই কমিশন মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে এবং সরকারের ভাবমূর্তি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নত হবে বলে বিবৃতিতে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।




