জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী সদস্যরা নির্দিষ্ট কোনো আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধি নন, কিন্তু তাদেরকেও এক বা একাধিক সাধারণ আসনে ‘উন্নয়ন কার্যক্রমে ভূমিকা’ রাখার বৈধ সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি নতুন আইনের খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। ‘জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪’ সংশোধন করে এই পথ উন্মুক্ত করতে চাচ্ছে সরকার। ‘জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ নামের ওই খসড়াটি ইতোমধ্যে আইন মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রেরণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে। মন্ত্রিসভার সবুজ সংকেত পেলে এটি দ্রুত সংসদে তোলা হবে।

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বিদ্যমান আইনের ২৬ ধারার পর নতুন একটি ধারা ২৬ক যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এর অধীনে, সংরক্ষিত নারী সদস্যদের জন্য এক বা একাধিক সাধারণ আসন তাদের কার্যক্ষেত্র হিসেবে নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল বা জোট। আর ঠিক কী কী দায়িত্ব ও কাজ তারা পালন করবেন, তা ঠিক করে দেবেন ওই দল বা জোটের সংসদীয় দলের প্রধান। প্রসঙ্গত, দলীয় সিদ্ধান্তটি লিখিতভাবে স্পিকারকে অবহিত করার বিধান থাকলেও এ ক্ষেত্রে স্পিকারের অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা রাখা হয়নি খসড়ায়। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের জোটের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বতন্ত্র সদস্যদের লিখিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে নারী সদস্যের কার্যক্ষেত্র ঠিক করে দেবেন স্পিকার। আর ঐকমত্য না হলে সংশ্লিষ্ট নারী সদস্য নিজেই তাঁর পছন্দের আসন উল্লেখ করে স্পিকারের কাছে আবেদন করবেন, এবং স্পিকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।

এই আইন সংশোধনের উদ্যোগের পেছনে সম্প্রতি সৃষ্ট একটি রাজনৈতিক বিতর্ককে চিহ্নিত করছে সংশ্লিষ্ট মহল। সম্প্রতি বিএনপি তাদের সংসদীয় দলের সভায় বিরোধী দলের সদস্যদের ৭৯টি আসনে উন্নয়ন তদারকি ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের জন্য দলীয় সংরক্ষিত নারী সদস্যদের দায়িত্ব বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেয়। একজন নারী সদস্যকে এক থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ চারটি করে আসনের এমনকি পুরো জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই তালিকায় জামায়াত, এনসিপি ও অন্যান্য বিরোধী দলের জেতা আসনও অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিএনপির পক্ষ থেকে যুক্তি দেখানো হয়, সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মতো সংরক্ষিত নারী সদস্যদেরও এলাকার উন্নয়নে অংশ নেওয়ার অধিকার রয়েছে। এর প্রতিবাদে জামায়াত ও এনসিপির নেতারা এই সিদ্ধান্তকে ‘অগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যূলক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি নির্বাচনী এলাকায় অপ্রয়োজনীয় সংঘাতের জন্ম দেবে।

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সংশোধনের খসড়ায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট নয়। যেমন, একজন সংরক্ষিত নারী সদস্যকে সর্বোচ্চ কতটি আসনের দায়িত্ব দেওয়া যাবে, তা নির্ধারণ করা হয়নি। কোনো দল কি কেবল নিজেদের জেতা আসনেই নারী সদস্যের কার্যক্ষেত্র বেঁধে দেবে, নাকি বিরোধী দলের আসনেও তা পারবে—তা স্পষ্ট নয়। ফলে একই সাধারণ আসনে ভিন্ন ভিন্ন দলের সংরক্ষিত নারী সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়া হলে বিরোধ নিরসনের কোনো পদ্ধতিও খসড়ায় বলা হয়নি।

এছাড়া ‘উন্নয়ন কার্যক্রমে ভূমিকা’ শব্দগুচ্ছের মাধ্যমে ঠিক কোন ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে, তাও পরিষ্কার নয়। খসড়ায় বলা হয়েছে, এই বণ্টনের কারণে সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরাসরি নির্বাচিত এমপির অধিকার ক্ষুণ্ন হবে না। কিন্তু একই আসনে একজন নির্বাচিত ও একজন মনোনীত সদস্যের দায়িত্ব ও কর্তৃত্বের সীমানা কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা উল্লেখ নেই।

সংসদবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও লোকপ্রশাসন অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ এই উদ্যোগের কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, “উন্নয়ন কার্যক্রমে ভূমিকা রাখার নামে এই আইন প্রণয়নের প্রচেষ্টা সম্পূর্ণরূপে অযৌক্তিক ও অনানযোগ্য। এটি সংসদ সদস্যদের কাজ নয়।” তিনি যুক্তি দেন, সংরক্ষিত নারী সদস্যরা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নন এবং তাদের কোনো নির্বাচনী এলাকা নেই— এটা জেনেই দলগুলো তাদের মনোনয়ন দেয়। এখন আইন করে তাদের জন্য সাধারণ আসনে দায়িত্ব দেওয়ার যুক্তি নেই। তাঁর মতে, এটি বিদ্যমান প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থাকে দুর্বল করে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হবে এবং সরাসরি নির্বাচিত এমপির সঙ্গে সংঘাত অনিবার্য। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের সংরক্ষিত সদস্যকে বিরোধী দলের জেতা আসনের দায়িত্ব দিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

উল্লেখ্য, সাবিধান অনুযায়ী ৩০০ জন সংসদ সদস্য সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন। আর সংরক্ষিত নারী আসনের ৫০ সদস্য নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে। বর্তমান দ্বাদশ সংসদে বিএনপি জোট ৩৬টি, জামায়াত জোট ১৩টি এবং স্বতন্ত্ররা মিলে ১টি সংরক্ষিত নারী আসন পেয়েছে। এই সদস্যরা বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধায় সাধারণ সদস্যদের সমমর্যাদা ভোগ করলেও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকা ছিল না। অতীতেও একই আসনে সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী সদস্যদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘর্ষে রূপ নেওয়ার রেকর্ড রয়েছে।