ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে আজ অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম সেমিফাইনাল। প্রতিপক্ষ হিসেবে মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দুই দেশ – স্পেন ও ফ্রান্স। যে দল এ ম্যাচে জয় পাবে, তারা ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। সেখানে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার দ্বিতীয় সেমিফাইনালের বিজয়ীর সাথে তাদের লড়াইয়ের অপেক্ষা।

স্পেনের মূল শক্তি তাদের মাঝমাঠ ও পাসিং নির্ভর খেলার ধরন। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল এ বিশ্বকাপে গড়ে ৬৫.৮ শতাংশ সময় বল নিজেদের দখলে রেখেছে। মাঝমাঠে রদ্রি এই দলের প্রধান ইঞ্জিন। বল দখল থেকে শুরু করে বল হারানোর পর আক্রমণাত্মক প্রেসিং – সব কিছু তিনি নিখুঁতভাবে সম্পাদন করছেন। ডান প্রান্তে আছেন ১৯ বছর বয়সী প্রতিভাবান লামিন ইয়ামাল। তার পাশাপাশি ডিফেন্সে কুকুরেয়া ও কুরবাসি, এবং গোলরক্ষক সিমন রয়েছেন। সিমন এ বিশ্বকাপে ৮ ম্যাচে মাত্র ১টি গোল হজম করেছেন, যা তার ওপর আস্থা রাখার যথেষ্ট কারণ। পক্ষান্তরে, ফ্রান্সের আক্রমণভাগ যেকোনো ডিফেন্সের জন্য ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। কিলিয়ান এমবাপ্পে একাই করেছেন ৮ গোল। তার সাথে বিশ্বসেরা উসমান দেম্বেলে রয়েছেন। এই জুটির পেছনে দারুণ সাপোর্ট দিচ্ছেন মাইকেল ওলিস, যিনি সর্বোচ্চ ৫টি অ্যাসিস্ট এবং ১৪টি নির্ভুল থ্রু বল প্রদান করেছেন। এছাড়া ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে জোড়া গোল করা দেসিরে দুয়েও রয়েছেন ফ্রান্সের লাইনআপে।

ইতিহাসের পরিসংখ্যান বলছে, স্পেন ও ফ্রান্সের মধ্যে এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ম্যাচগুলোর মধ্যে স্পেন জিতেছে ১৮ বার এবং ফ্রান্স ১৩ বার। সাম্প্রতিক সময়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, গত বছর উয়েফা নেশনস লিগের সেমিফাইনালে স্পেন ফ্রান্সকে ৫-৪ গোলে হারিয়েছিল। এর ১১ মাস আগে ২০২৪ সালের ইউরোর সেমিফাইনালেও স্পেন ফ্রান্সকে ২-১ গোলে পরাজিত করে ফাইনালে পৌঁছায়। অবশ্য ফ্রান্সও ওই প্রতিযোগিতায় প্রতিশোধ নিতে পেরেছে। ২০২১ সালের নেশনস লিগ ফাইনালে ফ্রান্স ২-১ এবং ১৯৮৪ সালের ইউরো ফাইনালে ২-০ ব্যবধানে জিতেছিল। বিশ্বকাপের মঞ্চে এ দুই দলের একমাত্র সাক্ষাৎ হয় ২০০৬ সালের শেষ ষোলোর ম্যাচে। সেবার জিনেদিন জিদানের অসাধারণ খেলায় ফ্রান্স ৩-১ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল।

বর্তমান বিশ্বকাপে নকআউট পর্বের ফর্ম বিচার করলে ফ্রান্সকে বেশি এগিয়ে রাখা যায়। কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত ফ্রান্সের ডিফেন্স এখনো কোনো গোল হজম করেনি। শেষ ৩২-এ সুইডেনের বিপক্ষে ৩-০, শেষ ষোলোতে প্যারাগুয়েকে ১-০, এবং কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফ্রান্স সেমিফাইনালে উঠেছে। অন্যদিকে স্পেনকে তুলনামূলক কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। নকআউট পর্বে পর্তুগালকে ১-০ এবং কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামকে ২-১ গোলে হারিয়েছে তারা। উভয় ম্যাচেই জয় এসেছে শেষ মূহুর্তে বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনোর করা গোলে।

ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে কাউন্টার-অ্যাটাক ও হাই-লাইন ডিফেন্সের লড়াই। স্পেন নিজেদের ফুটবল বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বল দখলে রেখে ছোট ছোট পাসে ফ্রান্সের ডিফেন্স ভাঙার চেষ্টা করবে। কিন্তু এটাই তাদের জন্য ফাঁদে পরিণত হতে পারে। কারণ এ বিশ্বকাপে ফ্রান্স আগের মতো শুধু রক্ষণাত্মক নয়, বরং কাউন্টার-অ্যাটাকে অত্যন্ত কার্যকর। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ফ্রান্স ইতোমধ্যে ৩২টি ডিরেক্ট অ্যাটাক সম্পন্ন করেছে, যা গত চার আসরের তুলনায় অনেক বেশি। এমবাপ্পের গতির সাথে তাল মিলানো স্পেনের ডিফেন্সের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে স্পেনের কাউন্টার-প্রেসিং দক্ষতা তাদের ভরসার জায়গা। বল হারানোর পর রদ্রি, ইয়ামালরা যেভাবে প্রতিপক্ষকে চেপে ধরে, তা ফরাসিদের প্রতি-আক্রমণের সুযোগ সীমিত করতে পারে।

সব বিষয় বিবেচনা করে ফ্রান্সকেই কিছুটা অগ্রগণ্য মনে হচ্ছে। এর কারণ হলো, নকআউট পর্বে স্পেনকে বেশি মানসিক ও শারীরিক শক্তি খরচ করতে হয়েছে। অপরদিকে ফ্রান্স তুলনামূলক স্বতঃস্ফূর্ত অবস্থায় আছে। দ্বিতীয়ত, এমবাপ্পের গতির মতো বাস্তব পরীক্ষার মুখোমুখি এখনো হয়নি স্পেনের হাই-লাইন ডিফেন্স। স্পেন যদি বল দখলের পাশাপাশি রদ্রির নেতৃত্বে ফ্রান্সের প্রতি-আক্রমণ মাঝমাঠেই আটকে দিতে পারে, তাহলে তারা টানা দ্বিতীয় বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠতে সক্ষম হবে। কিন্তু সামান্য ভুলেই ওলিসে-এমবাপ্পে জুটি স্পেনের ডিফেন্সকে বিপর্যস্ত করতে পারে। পজেশন ফুটবল ও গতির এই লড়াই নিঃসন্দেহে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক অসাধারণ উপভোগ্য মুহূর্ত তৈরি করবে।