সান ফ্রান্সিসকোর অন্যতম ধনী উপশহর মারিন কাউন্টির একটি স্কুলে সম্প্রতি এক অপ্রত্যাশিত সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয় শতাধিক শিক্ষক, পরামর্শদাতা ও উপদেষ্টাকে। সভায় উপস্থিত প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয় ৯,১৬১ দশমিক ৭০ ডলারের একটি করে চেক। স্থানীয় দানশীল মাজা ক্রিস্টিনের এক মিলিয়ন ডলার অনুদানের মাধ্যমেই এই অর্থ বিতরণ সম্ভব হয়েছে।
মারিন কাউন্টিতে মধ্যবিত্ত পরিবারের বার্ষিক আয়ের গড় প্রায় দেড় লাখ ডলার। অথচ রস ভ্যালি স্কুল ডিস্ট্রিক্টে শিক্ষকদের বেতন মাত্র ৬৪ হাজার ডলারের কাছাকাছি। অন্যদিকে, একই কাউন্টির অন্যান্য অঞ্চলে নতুন শিক্ষকদের প্রারম্ভিক বেতন প্রায় ৮০ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে। মধ্যম পর্যায়ে সেখানে বেতন ১ লাখ ৪২ হাজার ডলার ছুঁতে পারে, কিন্তু রস ভ্যালিতে তা ১ লাখ ২ হাজার ডলারে আটকে আছে। ফলে শিক্ষকদের এই বেতনকে ক্রিস্টিন অত্যন্ত কম বলে মনে করেন। যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষকদের মধ্যম বেতন প্রায় ৬৪ হাজার ২২০ ডলার হলেও, অনেক রাজ্যে তারা এর চেয়েও কম উপার্জন করেন এবং অন্য পেশাজীবীদের তুলনায় বেশি কর্মঘণ্টা দেন।
এই উদ্যোগের পেছনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে ক্রিস্টিন স্থানীয় টেলিভিশন স্টেশন কেআরওএন৪-কে জানান, নাগরিক হিসেবে সরাসরি চেক কেটে দেওয়া সম্ভব। তাঁর প্রত্যাশা, এই কাজের মাধ্যমে মারিনের বাসিন্দারা সরকারি শিক্ষার মূল্য অনুধাবন করে এগিয়ে আসবেন—সেটি সরাসরি অনুদানের মাধ্যমে হোক কিংবা রাজনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে। শিক্ষিকা আন্না শ্নেল জানান, তাঁর বর্তমান বেতনের সীমাবদ্ধতার কারণে সন্তানদের সব কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে পারেন না। নতুন এই অর্থের মাধ্যমে তিনি সন্তানদের কিছু ইচ্ছা পূরণ করতে পারবেন, যা তাঁর পরিবারের জন্য বিশেষ আনন্দের বিষয়।
অনুরূপ উদ্যোগ আগেও দেখা গেছে। গত বছর সান ফ্রান্সিসকোর একজন নাম-প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রযুক্তি কর্মী ১৬ লাখ ডলার অনুদান দিয়ে শহরের ৬ হাজার শিক্ষক ও প্যারা-শিক্ষকের প্রত্যেককে ২৫০ ডলারের উপহার কার্ড দেন। ২০২১ সালে ব্যবসায়ী ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব মার্কাস লেমনিস তাঁর মিয়ামির উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কর্মচারীকে ১৮ হাজার ডলারের চেক হস্তান্তর করেন। লেমনিসও বলেছিলেন, সরকার বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অপেক্ষা না করে নাগরিকদের নিজেদেরই সঠিক কাজ করা উচিত—যা ক্রিস্টিনের বক্তব্যের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
মাজা ক্রিস্টিনের পেশাগত যাত্রা শুরু হয় আইনজীবী হিসেবে। যৌন নির্যাতনের শিকারদের নাগরিক মামলায় তিনি বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। ক্যাথলিক চার্চের পুরোহিতদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম বিশেষভাবে পরিচিত। পরবর্তীতে তিনি স্ট্যানফোর্ড ল স্কুল, ইউসি বার্কলে স্কুল অব ল এবং ইউসি হেস্টিংস—যা এখন ইউসি ল সান ফ্রান্সিসকো—এ আলোচনা ও মধ্যস্থতা বিষয়ে শিক্ষকতা করেন। সান ফ্রান্সিসকোর সরকারি আবাসনে একক মায়ের তত্ত্বাবধানে বড় হওয়া ক্রিস্টিন কলেজ ও আইন শিক্ষার খরচ নিজেই বহন করেন। বার পাসের মাত্র দুই বছরের মধ্যে তিনি নিজস্ব আইনি ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন। টাইম ম্যাগাজিন একসময় তাঁকে আমেরিকার শীর্ষ দশ নারী আইনজীবীর একজন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।
একটি পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে ক্রিস্টিন “শেষ নিঃশ্বাস, শেষ টাকা” নামে একটি দর্শনের কথা বলেন। এর অর্থ, উত্তরাধিকারীদের হাতে সম্পদ না রেখে জীবিত অবস্থায়ই তা বণ্টন করা। যদিও তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ অজানা, তবুও তিনি বহু মিলিয়ন ডলারের অনুদান করেছেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে আমেরিকান রেড ক্রসে ৩০ লাখ ডলার এবং ২০২৩ সালে ইউসি বার্কলের মানবাধিকার কেন্দ্রে একই পরিমাণ অর্থ দান করেন। একই বছরে তিনি মারিন কাউন্টির নিকাসিওতে ১২০ একর জমি হ্যালেক ক্রিক রাঞ্চকে দান করেন, যা প্রতিবন্ধী শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ঘোড়ার থেরাপি ও সওয়ারির সুযোগ করে দেয়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত দাতা ছিলেন।
“সময়টি একেবারে উপযুক্ত ছিল,” পয়েন্ট রেয়েস লাইট-কে তিনি জানান। হ্যালেকের অবস্থান কাছাকাছি ছিল, এবং যোগাযোগের পর তারা জানায় যে তারা কার্যক্রম বিস্তৃত করতে ও জমি সংরক্ষণে আগ্রহী।




