বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো প্রবাসী আয়। ২০২৫ সালে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩ হাজার ২৮০ কোটি ডলার, যেখানে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন। তবে রেমিট্যান্সের এই অঙ্ক আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রায় ৪৩ শতাংশ স্বল্প-দক্ষ এবং ৩৪ শতাংশ আধা-দক্ষ হিসেবে বিবেচিত। ফলে গড়ে একজন বাংলাদেশি প্রবাসী মাসে ২০৩ ডলার পাঠালেও, ফিলিপাইনের মতো দেশের একজন শ্রমিক পাঠান প্রায় ৫৬৪ ডলার। এই পার্থক্যের মূল কারণ দক্ষতার স্তর। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ ‘মাইস্টার হাইস্কুল’ নামে কারিগরি শিক্ষার নতুন মডেল চালু করে দক্ষতা উন্নয়নে সফল হয়েছে। সেখানে ‘ভোকেশনাল স্কুল’ শব্দটি বাদ দিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সম্মান ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশেও কারিগরি শিক্ষার নাম ও ধারণা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। ‘স্কিলস অ্যান্ড প্রফেশনাল এডুকেশন’ বা ‘ইন্ডাস্ট্রি স্কিল এডুকেশন’—এমন নামকরণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে গর্ব তৈরি করতে পারে। শুধু নাম পরিবর্তন নয়, সনদের বিশ্বাসযোগ্যতাও জরুরি। সৌদি আরবের মতো দেশ ইতিমধ্যে স্কিল ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক করেছে। বাংলাদেশ যদি এই মানদণ্ডের সঙ্গে সিলেবাসকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে, তবে বিদেশে গিয়ে সনদের পুনরায় যাচাইয়ের প্রয়োজন হবে না। সরকার ইতিমধ্যে কারিগরি শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। ১২ হাজার কলেজশিক্ষককে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় টেকনিক্যাল স্কুল ও প্রতিটি জেলায় পলিটেকনিক স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারেও মাধ্যমিক স্তর থেকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার প্রতিশ্রুতি ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ সফল করতে তিনটি বিষয়ে নজর দিতে হবে। প্রথমত, নিয়োগদাতাদের বিশ্বাসযোগ্য একটি সনদ ব্যবস্থা। দ্বিতীয়ত, বাস্তব চাকরির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সিলেবাস। তৃতীয়ত, একটি সম্মানজনক নাম যা অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করে। অভিভাবকদের বাস্তব চিত্র দেখানো প্রয়োজন—যেমন একটি মানসম্পন্ন পলিটেকনিক ডিপ্লোমাধারী দুই বছরের মধ্যে সাধারণ গ্র্যাজুয়েটের চেয়ে বেশি আয় করতে পারে। চাহিদার কোনো অভাব নেই। জাপান ও জার্মানির মতো দেশে হাজার হাজার প্রশিক্ষণ পদ খালি রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো অল্প সংখ্যক কিন্তু মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন। সরকারের পরিকল্পনা কাগজে না থেকে বাস্তবে রূপ নেয় কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।