কুসুমতী নদীর তীরে একটি এতিম মেয়ে অলকা নিজের স্বপ্নের বাস্তবায়নে গড়ে তোলে এক অনন্য পাঠশালা। জন্মের পর মা ও পিতাকে হারানো অলকাকে মানুষ করেছে নদী, বাতাস ও তার কুকুর ছাই। তার জীবন ছিল কঠিন, কিন্তু স্বপ্ন ছিল বিশাল—যে শিশুরা বই কিনতে পারে না, তাদের অক্ষর শেখানো।
প্রথমে অলকা নদীর ধারে পুরোনো অশ্বত্থগাছের নিচে পাঁচজন শিশুকে নিয়ে পড়ানো শুরু করে। কয়েক মাসের মধ্যে শিশুদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তবে গ্রামের মোড়ল হরিপদ সরকার এই উদ্যোগে বাধা দেন। তিনি অনুমতি ছাড়া স্কুল চালানোর অভিযোগ তোলেন। অলকা তার পাঠশালা গোপনে চালিয়ে যায়। এক রাতে তার কুঁড়েঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়, যাতে তার সব সঞ্চয় ও ঘর পুড়ে যায়। কিন্তু অলকার সংকল্পে কোনো ফাটল ধরেনি। তিনি বলেন, 'ঘর পুড়েছে, স্বপ্ন তো নয়।'
ঘটনার পর গ্রামে আসেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অচিন্ত্য সেন। তিনি অলকার প্রচেষ্টায় মুগ্ধ হয়ে নিয়মিত পড়াতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষও সহায়তার হাত বাড়ায়। কেউ মাদুর, কেউ বই, কেউ বেঞ্চ দান করে। একজন কাঠমিস্ত্রি বিনা পয়সায় বাঁশের চালা তৈরি করে দেন। এই উদ্যোগের খবর জেলা শিক্ষা উন্নয়ন পরিষদের এক কর্মকর্তা জানতে পারেন। তিনি ছদ্মবেশে এসে শিশুদের পড়া শুনে যান এবং তার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরিষদ সিদ্ধান্ত নেয়, পাঠশালাটিকে একটি স্থায়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রূপ দেওয়া হবে। জমি, ভবন, বই, বেঞ্চ ও শিক্ষকের দায়িত্ব নেয় পরিষদ।
কয়েক মাসের মধ্যেই নদীর পাড়ে গড়ে ওঠে একতলা বিদ্যালয়। নাম রাখা হয় 'কুসুমতী মুক্ত পাঠশালা'। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হরিপদ সরকার নিজে এসে ক্ষমা চান এবং অলকাকে অভিনন্দন জানান। অলকা হয়ে ওঠেন বিদ্যালয়ের প্রথম শিক্ষিকা। বছর গড়ানোর পর এই বিদ্যালয় থেকে পড়া অনেক শিক্ষার্থী শহরে গিয়ে শিক্ষক, চিকিৎসক বা কৃষিবিজ্ঞানী হয়েছেন। তারা সময় পেলেই বিদ্যালয়ে ফিরে আসেন এবং অশ্বত্থগাছের নিচে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।
অনেক বছর পর এক শীতের ভোরে অলকা মারা যান। তার ইচ্ছানুযায়ী তাকে অশ্বত্থগাছের নিচে সমাহিত করা হয়। সমাধিতে খোদাই করা আছে—'যে আলো ভাগ করে, সে কখনো নিভে যায় না'। বর্তমানে বিদ্যালয়ের শিশুরা সেখানে পড়াশোনা করে। কেউ কেউ বিশ্বাস করে, বিকেলের শেষ আলোয় এখনও অলকা শিশুদের অক্ষর শিখিয়ে দেন।


