পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালার ৮,০৪৭ মিটার উচ্চতার ব্রড পিকে এক মর্মান্তিক তুষিধসে আন্তর্জাতিকখ্যিয়াতি সম্পন্ন পর্বতারোহী নির্মল পুরজার নেতৃত্বাধীন একটি আরোহণ দলের ১০ জন সন্ধানহীন হয়ে পড়েছেন। উদ্ধার প্রচেষ্টার সাথে জড়িত সূত্রগুলো থেকে প্রাপ্ত ধারণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এই অভিযাত্রীদলের কেউই সম্ভবত জীবিত নেই। পরিস্থিতি অত্যন্ত প্রতিকূল হওয়া সত্ত্বেও, পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত তাদের মৃত্যুর কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা প্রদান করেনি। এই ঘটনা বিশ্ব পর্বতারোহণ পরিমণ্ডলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

‘নিমস’ বা ‘নিমসদাই’ ডাকনামে পরিচিত ৪৩ বছর বয়সী এই কৃতী অভিযাত্রী একজন ব্রিটিশ-নেপালি নাগরিক। তাঁর স্মরণীয় কৃতির তালিকা দীর্ঘ। ২০১৯ সালে ‘প্রজেক্ট পসিবল’ নামক এক দুঃসাহসিক অভিযানে তিনি বিশ্বকে তাক করিয়ে দেন। আট হাজার মিটারের চেয়ে উঁচু বিশ্বের ১৪টি পর্বতশৃঙ্গ জয়ের রেকর্ড তিনি স্থাপন করেন মাত্র ছয় মাস ছয় দিনে, যা সে সময় ছিল দ্রুততম। এই বিস্ময়কর অভিযান পরবর্তীকালে ‘১৪ পিকস: নাথিং ইজ ইমপসিবল’ শিরোনামের একটি নেটফ্লিক্স প্রামাণ্যচিত্রে ফুটে ওঠে, যা তাকে বিশ্বব্যাপী এক পরিচিত মুখে পরিণত করে।

নেপালের মিয়াগদি জেলার একটি ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামে জন্ম তাঁর। গুর্খা পরিবারে লালিত-পালিত হয়ে বাল্যকাল থেকেই পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও অদম্য সাহসের পাঠ তিনি রপ্ত করেছিলেন। আঠারো বছর পূর্ণ হওয়ার পর তিনি গুর্খা রেজিমেন্টে যোগদান করেন এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের বিশেষ বিশেষ বাহিনীতেও সক্রিয় দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। ২০১২ সালে এভারেস্টের বেসক্যাম্পে একটি সাধারণ ভ্রমণেই তার মনোভব ওলট-পালট হয়ে যায় এবং সেখানেই পর্বতারোহণকে নেশা হিসেব বেছে নেন। ৬,১১৯ মিটার উচ্চতীয় লোবুচে ইস্ট পর্বগম জয় ছিল তার প্রথম উল্লেখযোগ্য বিজয়।

২০১৯ সালে এভারেস্টের চূড়ার কাছে সবারশত পর্বতারোহীর দীর্ঘ সারির যে আলোকচিত্র তিনি তুলেছিলেন, তা ভাইরাল হয়ে বিশ্বের সর্বোচ্চ শিখরে মাত্রাধিক ভিড় ও সুরক্ষা ঝুঁকির ব্যাপারে এক নতুন চর্চা আরম্ভ করে দেয়। তিনিই একমাত্র অভিযাত্রী, যিনি মাত্র ৪৮ ঘণ্টার অর্ন্তগত এভারেস্ট, লোৎসে ও মাকালু—এই তিনটি আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার বিশাল শিখর আরোহণ করতে সমর্থ হন। ২০২১ সালে আরও নয় জন নেপালি সহযোদ্ধার সঙ্গে একত্রিত হয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত কে-২ এর প্রথম সফল শীতকালীন আরোহণের রেকর্ড গড়েন। বর্তমান যুগের পর্বতারোহণ ইতিহাসে এ এক যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত।

খ্যাতি ও সুপরিচিতির শীর্ষে পৌঁছেও তিনি কেবল আত্মকেন্দ্রিক থাকেননি। বরাবরই বিদেশি অভিযানসমূহের সফলতার পিছনে নেপালি শেরপা এবং পার্বত্য অঞ্চলের পথপ্রদর্শকদের যে অনস্বীকার্য ভূমিকা থাকে, তার ন্যয্য স্বীকৃতির প্রশ্নে তিনি একজন বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেন। ২০২৬ সালের জন্য তার স্বপ্ন ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি অভীষ্ট—অক্সিজেন সিলিন্ডারের সহায়তা ব্যাতিরিকেই বিশ্বের ১৪টি আট-হাজারি চূড়া দ্বিতীয় দফায় জয় করে এক নতুন ইতিহাস রচনা। সেই অভীষ্টের পথ বেয়েই তিনি প্রথমে গাশেরব্রুম–২ শৃঙ্গ জয়ের পর ব্রড পিকে এই অভিযান পরিচালনা করতে গিয়েছিলেন।