কাহারোল উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামে অবস্থিত ‘পৃথ্বী এগ্রো’ নামের খামারটি এখন দিনাজপুর অঞ্চলের একটি পরিচিত নাম। ১০৭ শতক জমির ওপর বিস্তৃত এই খামারে বর্তমানে দেশি ও বিদেশি জাতের ৪৫টি গরুর পাশাপাশি ভারতীয় সংকর জাতের ৫২টি মহিষ পালন করা হচ্ছে। খামারের মালিক মীর মহসীন আলী চৌধুরী (৪৮) একসময় ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। ২০০৭ সালে দিনাজপুর সরকারি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর তিনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আত্মকর্মসংস্থানে কাজ করা ওই প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। বিভিন্ন জেলা ঘুরে তিনি সফল খামারিদের কার্যক্রম ও আধুনিক প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনার কৌশল প্রত্যক্ষ করেন। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে নিজ গ্রামে ফিরে আসতে উৎসাহিত করে।
২০১৬ সালে মাত্র ১৩টি দেশি গরু নিয়ে যাত্রা শুরু হয় এই খামারের। ধীরে ধীরে লাভের টাকা দিয়ে তিনি আরও ৫৭ শতক জমি কিনে নেন; বর্তমানে মোট জমির পরিমাণ ১০৭ শতক। সেখানে ২৪০ ফুট দীর্ঘ ও ৯০ ফুট প্রস্থের তিনটি সংলগ্ন শেড নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলোতে গরু ও মহিষের মোটাতাজাকরণ কার্যক্রম চলে। প্রতিদিন ভোর থেকেই খামারে ব্যস্ততা শুরু হয়—কর্মীরা খড় কাটেন, দানাদার খাদ্য প্রস্তুত করেন এবং কৃত্রিম ঝরনার নিচে পশুদের গোসল করান। পাশের শেডে গবাদিপশুরা নিশ্চিন্তে জাবর কাটে। পাইকারেরা খামার পরিদর্শন করে দরদাম মিললে সেখানেই বেচাকেনা সম্পন্ন করেন। প্রবেশপথে লেখা নামফলক থেকে বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কত বড় আয়োজন রয়েছে।
খামারে নিয়মিত ১০ থেকে ১৫ জন কর্মচারী মাসিক বেতন ও দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে কাজ করেন। শ্রমিক দেবনাথ রায় জানান, প্রতিটি গরু ও মহিষকে দৈনিক ১২ থেকে ২২ কেজি পর্যন্ত খাদ্য দেওয়া হয়। খাদ্যতালিকায় রয়েছে খড়, ভুসি, খইল, সাইলেজ ও নেপিয়ার ঘাস। গুদামে ড্রাম, হাউস ও বস্তায় দুই থেকে আড়াই মাসের খাদ্য মজুত রাখা হয়। মহসীন নিজেই প্রায় আট বিঘা জমিতে নেপিয়ার ঘাস চাষ করেন; পাশাপাশি স্থানীয় সরবরাহকারীরাও ঘাস জোগান দেন। তিনি নিজ হাতে পশুদের খাদ্য তুলে দেন এবং স্নেহভরে তাদের গলায় ও মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। খামারের গরুগুলোর ওজন বর্তমানে ১০০ থেকে ৪০০ কেজি এবং মহিষগুলোর ওজন ২৫০ থেকে ৫০০ কেজির মধ্যে। তিন মাস পরপর তিনি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে পশু বিক্রি করেন। পাশাপাশি কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও রাজশাহীর বাজার থেকে তুলনামূলক কম দামে গরু ও মহিষ কিনে এনে মোটাতাজ করে পুনরায় বিক্রি করেন। মহসীন জানান, একটি মহিষের সর্বনিম্ন দাম ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। বর্তমানে শুধু মহিষগুলো বিক্রি করলে অন্তত সোয়া কোটি টাকা পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মহসীন বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাবাকে গবাদিপশু পালন করতে দেখেছেন। চাকরির মনোযোগ না পেয়ে অল্প পুঁজি নিয়ে তিনি খামার শুরু করেন। তাঁর ভাষায়, “সারা দিন যত কাজই করি না কেন, খামারে এসে দাঁড়ালে একধরনের মানসিক প্রশান্তি পাই। পশুগুলোর সঙ্গে সময় কাটানোই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।” তিনি মনে করেন, খামারে সফল হতে হলে মনোযোগ ও সময় দেওয়া জরুরি। আজকাল তরুণরা পড়াশোনা শেষ করে চাকরির পেছনে ছুটছেন—কিন্তু এই খাতে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর সাফল্য দেখে এলাকার অনেকেই ছোট পরিসরে গরু পালন শুরু করেছেন। তাঁদের একজন জলিল আহমেদ জানান, মহসীনের পরামর্শে তিনটি গরু দিয়ে তিনি খামার শুরু করেন এবং এখন এলাকায় অনেকেই এ পথে এগোচ্ছেন।
খামারের কর্মী সাদিকুর রহমান জানান, পড়াশোনার পাশাপাশি প্রায় এক বছর ধরে তিনি এখানে কাজ করছেন। দুই শিফটে ১২ জন কর্মচারী কাজ করেন। তাঁর দায়িত্ব গরু-মহিষকে গোসল করানো। মাসিক বেতনে তাঁর সংসার চলে। তিনি বলেন, কাজটি করতে ভালো লাগে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সরফরাজ আলী জানান, এটি উপাজেলায় একমাত্র মহিষের খামার। শুরু থেকেই মহসীন তাঁদের পরামর্শ নিয়ে খামার গড়ে তুলেছেন। বয়স ও ওজনভেদে খাদ্য ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত টিকাদান ও পরিচর্যার বিষয়ে তাঁকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা নিয়মিত খামার পরিদর্শন করেন। তাঁর সাফল্য দেখে এলাকার অনেক মানুষ এখন ছোট পরিসরে গরু পালন শুরু করেছেন—এটি সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মনে করেন কৃষি কর্মকর্তা।




