সম্প্রতি ‘এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিশ্বজুড়ে বৃষ্টির পানিতে পিএফএএস নামক চিরস্থায়ী রাসায়নিকের উপস্থিতি উদ্বেগজনক মাত্রায় পাওয়া গেছে। সুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ রসায়নবিদ ইয়ান কাজিনসের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, এই রাসায়নিকের পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইপিএ) ও অন্যান্য দেশের নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে বহুগুণ বেশি। পিএফএএস মূলত ওয়াটারপ্রুফ পোশাক, ননস্টিক রান্নার সরঞ্জাম, খাবারের প্যাকেট ও কৃত্রিম ঘাস তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এটি মানবদেহে ক্যানসার, যকৃত ও থাইরয়েডের রোগ এবং শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এমনকি টিকার কার্যকারিতাও হ্রাস পেতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থা (সিডিসি) জানিয়েছে, বৃষ্টির পানি সরাসরি পান করলে বাতাসে থাকা ধুলা, ধোঁয়া, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস শরীরে প্রবেশের আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে ছাদে জমা পানির সঙ্গে পাখির বিষ্ঠা ও পুরোনো পাইপ থেকে সিসা-তামার মতো বিষাক্ত ধাতু মিশে যেতে পারে। খোলা পাত্রে পানি জমিয়ে রাখলে মশার প্রজনন ও পচা পাতাও পানি দূষিত করে।

পিএফএএস সহজে ভেঙে বা নষ্ট হয় না বলে একে ‘চিরস্থায়ী রাসায়নিক’ বলা হয়। বিশ্বের সবচেয়ে নির্জন এলাকা তিব্বত মালভূমি ও অ্যান্টার্কটিকার বৃষ্টির পানিতেও এই রাসায়নিকের মাত্রা নিরাপদ মাত্রার চেয়ে অন্তত দশগুণ বেশি পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা, সমুদ্রের পানি থেকে বাষ্পীভূত হয়ে পিএফএএস বায়ুমণ্ডলে পৌঁছে এবং মেঘের মাধ্যমে দূরবর্তী অঞ্চলে বৃষ্টি হিসেবে ঝরে পড়ছে।

বৃষ্টির পানি ফুটিয়ে বা সাধারণ ফিল্টারের মাধ্যমে পিএফএএস দূর করা সম্ভব নয় বলেও জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এমনকি ঘরের কলের পানিতেও অল্প পরিমাণে এই রাসায়নিক থাকতে পারে, তবে তা সাধারণত নিরাপদ সীমার মধ্যে থাকে। তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেখানে বহু মানুষ পানি সংগ্রহের জন্য বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল, সেখানে এটি একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করেছে। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার মতো কিছু অঞ্চলেও বৃষ্টির পানি পানের প্রচলন এখনো জনপ্রিয়, যা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

পিএফএএস একবার নদী-নালা ও সমুদ্রে পৌঁছালে ধীরে ধীরে এর ঘনত্ব কমতে পারে, কিন্তু এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির। সফল হতে বহু দশক সময় লাগতে পারে। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ এই রাসায়নিক ব্যবহার নিষিদ্ধ বা সীমিত করলেও পরিবেশ থেকে এটি এখনও পুরোপুরি অপসারিত হয়নি। বিজ্ঞানীদের মতে, পিএফএএসের কারণে পৃথিবী ইতিমধ্যে নিরাপদ সীমার বাইরে চলে গেছে, যা মানব অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি।