বৃহস্পতিবার মুক্তি পেতে যাচ্ছে রাজকুমার সন্তোষী পরিচালিত 'বাটওয়ারা ১৯৪৭'। সানি দেওল, প্রীতি জিনতা, শাবানা আজমি, করন দেওল, আলী ফজল ও অভিমন্যু সিং অভিনীত এই ছবিটি প্রযোজনা করেছেন আমির খান। ভারতের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে মুক্তি পাওয়া ছবিটির পটভূমি দেশভাগ-পরবর্তী লাহোর। সেখানে একটি মুসলিম পরিবার একটি পুরোনো হাভেলিতে ওঠে, কিন্তু সেই বাড়িতে থেকে যাওয়া এক বৃদ্ধ হিন্দু নারী নিজের পূর্বপুরুষের সম্পত্তি বলে দাবি করেন। দুই পরিবারের এই সংঘর্ষ দেশভাগের বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতীক হয়ে ওঠে — একই ঘর, কিন্তু বদলে যাওয়া পরিচয়, অধিকার ও সম্পর্কের অর্থ। দীর্ঘ বিরতির পর পর্দায় ফেরা প্রীতি জিনতা এই ছবিতে হামিদা চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যাকে দেশভাগের ভয়াবহতার মধ্যে পরিবার ও সন্তানদের রক্ষার লড়াই করতে হয়। অভিনেত্রীর মতে, সেই সময়ের নারীদের সামনে নিজের জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল খুবই সীমিত।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান গঠিত হওয়ার সময় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অভিবাসনগুলোর একটি ঘটে। এক কোটির বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে সীমান্ত পেরিয়েছিলেন এবং সহিংসতায় প্রাণ হারান আনুমানিক ১০ লাখ বা তারও বেশি মানুষ। দেশভাগ তাই কেবল রাজনৈতিক ঘটনা নয়, এটি ব্যক্তিগত স্মৃতি — কারও দাদার ফেলে আসা বাড়ি, কারও নানির ট্রেনের গল্প, কারও হারিয়ে যাওয়া আত্মীয়। সব মিলিয়ে এটি উপমহাদেশের মানুষের পারিবারিক স্মৃতির অংশ।
দেশভাগ নিয়ে হিন্দি সিনেমার আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নামগুলোর একটি এম এস সত্যুর ১৯৭৩ সালের 'গরম হাওয়া'। বলরাজ সাহনির অভিনয়ে সালিম মির্জা দেশভাগের পরও জন্মভূমি ছাড়তে চাননি, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক সন্দেহ ও অর্থনৈতিক সংকট ধীরে ধীরে তাঁর পৃথিবী বদলে দেয়। ছবিটি দেশভাগকে ভারত বনাম পাকিস্তানের গল্প না বানিয়ে মানুষের ওপর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব হিসেবে দেখিয়েছিল। ভীষ্ম সাহনির উপন্যাস অবলম্বনে গোবিন্দ নিহালনির 'তমস' দেখায়, কীভাবে গুজব ও রাজনৈতিক উসকানি পাশাপাশি থাকা মানুষকে শত্রুতে পরিণত করে। খুশবন্ত সিংয়ের উপন্যাস অবলম্বনে পামেলা রুকসের 'ট্রেন টু পাকিস্তান' পাঞ্জাবের সীমান্তবর্তী কাল্পনিক গ্রাম মানো মাজরার মানুষের সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে দেশভাগের বিপুল ইতিহাসকে নামিয়ে আনে।
দীপা মেহতার '১৯৪৭: আর্থ' একটি শিশুর চোখে দেখায়, কীভাবে রাজনৈতিক বিভাজন ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব ভেঙে দেয়। আমির খান, নন্দিতা দাস ও রাহুল খান্না অভিনীত ছবিটি দেখায় যে মানুষগুলো একসঙ্গে হাসত, আড্ডা দিত; তারাই কীভাবে পরিচয়ের রাজনীতিতে বদলে যায়। অমৃতা প্রীতমের উপন্যাস অবলম্বনে চন্দ্রপ্রকাশ দ্বিবেদীর 'পিঞ্জর' দেশভাগের গল্পকে নারীর শরীর ও পরিচয়ের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। ঊর্মিলা মাতন্ডকর অভিনীত চরিত্রটির ওপর পরিবার, ধর্ম ও ভালোবাসা সবকিছুর সিদ্ধান্ত অন্যরা নিতে থাকে। পাকিস্তানি নির্মাতা সাবিহা সুমারের 'খামোশ পানি' ১৯৭৯ সালের পটভূমিতে ১৯৪৭-এর স্মৃতি ফিরিয়ে আনে এক বিধবা মা ও ছেলের জীবনে। ছবিটি লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন লিওপার্ডসহ একাধিক পুরস্কার পায়।
২০০১ সালের 'গদার: এক প্রেম কথা' দেশভাগের সিনেমাকে ভিন্ন মাত্রা দেয়। সানি দেওলের তারা সিং পাকিস্তানে গিয়ে স্ত্রী ও সন্তানকে ফিরিয়ে আনার লড়াই করে। এখানে দেশভাগ মানবিক ট্র্যাজেডির পাশাপাশি অ্যাকশন, প্রেম, আবেগ ও জাতীয়তাবাদের বিশাল ক্যানভাস। ২০২৬ সালে মুক্তির ২৫ বছর পূর্তিতেও ছবিটির জনপ্রিয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই ধারাতেই ২০২৬ সালে এল ইমতিয়াজ আলীর 'ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা'। দিলজিৎ দোসাঞ্জ, শর্বরী, বেদাং রায়না ও নাসিরুদ্দিন শাহ অভিনীত ছবির কেন্দ্রে এক বৃদ্ধের স্মৃতি। দেশভাগের সময় হারিয়ে যাওয়া প্রেমের কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কয়েক দশক পরও তাঁর মধ্যে বেঁচে থাকে। এখানে স্মৃতিভ্রংশ কেবল অসুস্থতা নয়; অতীতে ফিরে যাওয়ার এক অদ্ভুত দরজা। বৃদ্ধের নাতি তার বিচ্ছিন্ন প্রলাপের প্রতিটি শব্দের অর্থ খোঁজে। বৃদ্ধের স্মৃতি উদ্ধারের চেষ্টা আসলে একটি হারিয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প উদ্ধারের চেষ্টা, যা ইতিহাসকে মানুষের গল্প হিসেবে বোঝারও চেষ্টা।
দেশভাগ নিছক ইতিহাস নয়। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ — তিন দেশেই অসংখ্য পরিবারের স্মৃতিতে এর ছাপ। দাদা-দাদির গল্প, ফেলে আসা বাড়ির ছবি, পুরোনো চিঠি, হারিয়ে যাওয়া আত্মীয় — এসব পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও গল্প হয়ে পৌঁছেছে। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের টানাপোড়েন, সীমান্ত, কাশ্মীর, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি — সবকিছুর সঙ্গে ১৯৪৭-এর উত্তরাধিকার কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। তাই দেশভাগ নিয়ে ছবি বানানো মানে শুধু অতীত দেখানো নয়; অনেক সময় বর্তমানকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা। মানচিত্রে দেশভাগ হয়েছিল ১৯৪৭ সালে, কিন্তু ভাগ হয়ে যাওয়া মানুষের গল্প শেষ হয়নি; প্রজন্মের পর প্রজন্মে তা ফিরে আসে নতুন করে।




