চট্টগ্রামের রাউজানে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের ‘প্রজা’ মনে করেন, আর সন্ত্রাসীরাই যেন ‘রাজা’। খবরটি প্রকাশ করেছে প্রথম আলো।
সরেজমিন অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, রাউজানের গরিবউল্লাহ পাড়ায় প্রবেশ করতে গেলে সিএনজিচালকদের কঠোর যাচাইয়ের মুখে পড়তে হয়। যাত্রীদের নাম, গন্তব্য এবং সেখানে কার কাছে যাচ্ছেন—সব জানতে হয়। কারণ, এলাকায় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী সন্ত্রাসী পক্ষ মিলে চালক ও যাত্রীদের তল্লাশি করে। এই পাড়ার ভান্ডারি কলোনিতেই গত বছরের ১৯ এপ্রিল রাতে নিজ বাড়িতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন প্রবাসফেরত যুবদল কর্মী মানিক আবদুল্লাহ। হত্যার পর তাঁর পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে, আর প্রতিবেশীরা হত্যাকারীদের চিনলেও নাম বলতে রাজি নন।
শুধু গরিবউল্লাহ পাড়াই নয়, রাউজানের বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ঈশান ভট্টের হাটে স্ত্রী-সন্তানের সামনে খুন হন যুবদল নেতা মো. সেলিম, পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারে শত মানুষের সামনে নিহত হন মাসুদুল হক চৌধুরী, গাজীপাড়ায় মুহাম্মদ ইব্রাহিম এবং পশ্চিম রাউজানে আলমগীর আলম—সবাই যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। হত্যার স্থান ভিন্ন হলেও কৌশল প্রায় একই—মোটরসাইকেল বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় এসে প্রকাশ্যে গুলি, এরপর পাহাড়ি পথ ধরে পালিয়ে যাওয়া।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রাউজানে অন্তত ২৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষে আহত হয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ। এসব হত্যাকাণ্ডের অন্তত ১৬টির সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এমনকি গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও রাউজানে ছয়টি খুন হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, খুন এখানে শুধু প্রতিপক্ষকে সরানোর ঘটনা নয়; বাজারের চাঁদাবাজি, বালুমহাল, নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসা এবং এলাকাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠারও হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। স্থানীয় এক বাসিন্দার ভাষ্য, ‘এখানে মানুষ প্রজার মতো। সন্ত্রাসীরাই রাজা।’
ভৌগোলিক অবস্থানও অপরাধীদের সহায়তা করছে। চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে রাউজান। পশ্চিমে হালদা নদী, দক্ষিণে কর্ণফুলী এবং পূর্বে রাঙ্গুনিয়া ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়—এই নদী, পাহাড় ও প্রধান সড়কের সংযোগ অপরাধী গোষ্ঠীগুলোকে হামলার পর পালানোর একাধিক পথ দিয়েছে।
এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব চলছে। এক পক্ষে স্থানীয় সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, অন্যপক্ষে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক গোলাম আকবর খন্দকার। দুই পক্ষের বিরোধ ইউনিয়ন, বাজার ও পাড়া পর্যন্ত ছড়িয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া, বাজার ও বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ এবং নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ নিয়ে তাঁদের অনুসারীরা মুখোমুখি হচ্ছেন।
গত বছরের জুলাইয়ে দুই পক্ষের বড় সংঘর্ষে গোলাম আকবরসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন। পরে বিএনপি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করে এবং গিয়াস কাদেরের দলীয় পদ স্থগিত করে। গিয়াস কাদেরের বিরুদ্ধে দলীয় হানাহানি ও সংঘাতে মদদ দেওয়া এবং এলাকায় ‘ত্রাসের রাজত্ব’ কায়েমের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ এনেছে।
অন্যদিকে গোলাম আকবর খন্দকারের ভাষ্য, ‘রাউজানের অপরাধ ও খুনোখুনিতে কোনো পক্ষ-বিপক্ষের বিষয় নেই। এখন যা হচ্ছে তার সবই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর লোকজনই করছে।’ দখল, চাঁদাবাজি, মাটি ও বালুর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে খুনোখুনি হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই টাকা কারা নেয় এবং শেষ পর্যন্ত কার কাছে যায়, তা অনুসন্ধান করলেই জানা যাবে।
পুলিশ বলছে, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের সহযোগী মো. রায়হান, মোবারক হোসেন ওরফে ইমন, মো. কাদের, ধামা ইলিয়াসসহ কয়েকজন চাঁদাবাজি করছেন এবং ভাড়াটে খুনি হিসেবে কাজ করছেন। একাধিক ঘটনার অস্ত্রধারীদের শনাক্ত করা হয়েছে। পাহাড় ও সমতলে অভিযান চলছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, অপরাধ করেই সন্ত্রাসীরা পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে চলে যায়। আধিপত্য বিস্তার ও বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বেশির ভাগ ঘটনার সূত্রপাত। তিনি জানান, সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং ড্রোন ব্যবহার করে তাদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে। আতঙ্ক কমাতে তল্লাশিচৌকি ও টহল বাড়ানো হয়েছে।
তবে নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের অভিযোগ, শুধু সরাসরি হত্যায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করলে পরিস্থিতি বদলাবে না। যাঁরা টাকা, তথ্য, অস্ত্র ও রাজনৈতিক আশ্রয় দিচ্ছেন, তাঁদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত হোসেনের মতে, রাউজানে এই পরিস্থিতির পেছনে রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন বড় ভূমিকা রাখছে। একই রাজনৈতিক দলের দুটি পক্ষ আধিপত্য বিস্তারের জন্য মুখোমুখি হচ্ছে। যারা লোকবল দেখাতে, এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতে কিংবা প্রতিপক্ষকে দমন করতে পারে, রাজনীতিতে তাদের মূল্যায়ন করার প্রবণতা রয়েছে। এতে চিহ্নিত অপরাধীরাও রাজনৈতিক আশ্রয় পাচ্ছে। তাই কেবল সন্ত্রাসী নয়, তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা ও সহায়তাকারীদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।




