মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বেতবাড়িয়া গ্রামের একটি পরিত্যক্ত জমি থেকে উদ্ধার হওয়া ৯৬টি মাইন ধ্বংস করেছে যশোর সেনানিবাসের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল। সোমবার বিকেলে মধুগাড়ি গ্রামের মাথাভাঙ্গা নদীর পাড়ে চার দফা বিকট শব্দে বিস্ফোরণের মাধ্যমে এই মাইনগুলো ধ্বংস করা হয়। বিস্ফোরণের সময় আশপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে এবং স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ঘটনার সূত্রপাত শনিবার দুপুরে, যখন বেতবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা নুরুজ্জামান কালু নিজের জমিতে মাটি কাটছিলেন। কোদালের আঘাতে মাটি থেকে ছয়টি ধাতব বস্তু বেরিয়ে আসে, যেগুলোর গায়ে লেখা ছিল 'পি ডি এফ জি এল ৬৩, লট ৩৭, মাইন ১৯৬৭'। বিষয়টি জানাজানি হলে পুলিশ ও বিজিবি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। পরে পুলিশ সেনাবাহিনীর বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করে।

গতকাল দুপুরে যশোর সেনানিবাসের ১৯ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল মেজর তরিকুল ইসলামের নেতৃত্বে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। উদ্ধার করা মাইনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সেগুলো নিরাপদ স্থানে নিয়ে বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে মাইনগুলো সংগ্রহ করে মাথাভাঙ্গা নদীর পাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে পাঁচটি বড় গর্ত খোঁড়া হয়। মাইনগুলো বস্তায় ভরে গর্তে নামানোর পর ওপরে বালু ও মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এরপর বৈদ্যুতিক তারের সংযোগ দিয়ে সেনাসদস্যরা প্রায় ৫০০ মিটার দূরে সরে যান।

বোমা নিষ্ক্রিয় করার নিয়ম মেনে বিস্ফোরণের সময় সেনাসদস্যরা মাটিতে শুয়ে পড়েন। বিকেল থেকে একে একে বিস্ফোরণ ঘটানো শুরু হয়, এবং প্রথম চারবার সফলভাবে বিস্ফোরণ সম্পন্ন হয়। বিকট শব্দে বিস্ফোরণের সময় মাঠের মাটি উড়ে যায়, যা দেখে আশপাশের মানুষজন ভীত হয়ে ছোটাছুটি শুরু করেন।

স্থানীয় কৃষক হানা মিয়া, বাহাদুর, মিরন ও লালু জানান, প্রথমে তাঁরা ভেবেছিলেন এগুলো খালি বাক্স মাত্র। কিন্তু বিস্ফোরণের বিকট শব্দে তাঁরা ভয় পেয়ে যান। স্থানীয় নির্মাণশ্রমিক মামুন মিয়া বলেন, তিনি হাতে নিয়ে জিনিসগুলো নেড়েচেড়ে দেখেছিলেন এবং ভাবতেই পারেননি এগুলো এত মারাত্মক হতে পারে। এখন পুরো এলাকার মানুষ ভয়ের মধ্যে রয়েছে—আরও মাইন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কি না, সেই চিন্তায়।

গাংনী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাদ্দিদ মোরশেদ জানান, উদ্ধার করা মাইনগুলোর মধ্যে ১৭টি ট্যাংক-বিধ্বংসী এবং ৭৯টি মানববিধ্বংসী ছিল। সেনাসদস্যরা নিজস্ব প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেগুলো সফলভাবে ধ্বংস করেছেন। ওই এলাকায় আরও কোনো বিস্ফোরক দ্রব্য রয়েছে কি না, তা পুলিশ খতিয়ে দেখছে। একই সঙ্গে সন্দেহজনক কোনো বস্তু চোখে পড়লে অবিলম্বে পুলিশকে জানানোর জন্য সাধারণ মানুষকে আহ্বান জানান তিনি।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফার ধারণা, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই মাইনগুলো মাটির নিচে পুঁতে রেখেছিল। দীর্ঘ ৫৫ বছর পর সেই মাইনগুলো উদ্ধার করে ধ্বংস করার ঘটনায় এলাকায় এখন স্বস্তি বিরাজ করছে।