রাজশাহীর অন্যতম পান বিক্রয়কেন্দ্র মোহনপুরের মৌগাছি হাটে সম্প্রতি চাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে দাম নিয়ে তীব্র অসন্তোষ লক্ষ্য করা গেছে। রোববার সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ফজরের নামাজের পর চাষিরা পান নিয়ে হাটে উপস্থিত হন। হাটের ভেতরে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় অনেকেই রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের দুই পাশে বসে বিক্রি শুরু করেন। সেখানে হাঁকডাকে পান বিক্রি চলে, এক পাশে পানের পাশাপাশি সুপারিও বিক্রি হতে দেখা যায়। হাটটি সকাল নয়টা পর্যন্ত চলতে থাকে।

হাটে বিক্রি হওয়া ছোট আকারের পানের দাম মানভেদে প্রতি বিড়া ১০ থেকে ২৫ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। বড় আকারের পান প্রতি বিড়া ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হলেও তা উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় অত্যন্ত কম। এখানে উল্লেখ্য যে, রাজশাহীতে এক বিড়ায় ৬৪টি পান পাতা থাকে এবং ৩২ বিড়ায় এক পোয়া হয়। বাজারে বিড়া ও পোয়া—উভয় হিসাবেই লেনদেন চলে।

চাষিরা জানান, বরজ তৈরি ও পরিচর্যায় ব্যয়ের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বাঁশসহ অন্যান্য উপকরণের দামও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। মোহনপুরের চাষি মো. সোহেল রানার হিসাব অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে বরজ তৈরি ও চারা রোপণে প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয় হয়। এরপর সারা বছরের সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিক মজুরি মিলিয়ে আরও প্রায় এক লাখ টাকা লাগে। অর্থাৎ, বছরে মোট দুই লাখ টাকা বিনিয়োগের পরও পান বিক্রি থেকে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পাওয়া যাচ্ছে, যা খরচের অর্ধেকও নয়। তাঁর ভাষ্য, লাভ দূরের কথা, হাতে নগদ টাকা পাওয়ার তাগিদেই এখন পান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন চাষিরা।

আরেক চাষি মো. এরশাদ বলেন, প্রতি বিড়া পান অন্তত ১৫ টাকা পাওয়ার আশা করেছিলেন। কিন্তু হাটে দাম বলা হচ্ছে মাত্র ১০ টাকা। তাঁর মতে, এক বিঘা জমিতে পান চাষ করে এখন চরম লোকসান গুনতে হচ্ছে। সংসার চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। একই এলাকার মো. জিয়াউল ইসলাম জানান, এক বিড়া পান ৩৫ টাকায় বিক্রি হলে কোনো রকমে খরচ ওঠে। বর্তমানে সেই দামের তিন ভাগের এক ভাগও পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, লাভ তো দূরের কথা, শুধু হাতে নগদ টাকা পাওয়ার জন্য পান বিক্রি করতে হচ্ছে।

ত্রিমোহনী এলাকার চাষি মো. ইয়ামিন আলী ১০ কাঠা জমিতে পান চাষ করেন। তাঁর ভাষ্য, বরজ পরিচর্যায় বছরে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। খইল, সার, কীটনাশক ও সেচে বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় হয়। অথচ হাটে প্রতি বিড়া ২০ টাকা দাম বলা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতি বিড়া ৫০ টাকা না পেলে টিকে থাকা কঠিন।

হাটে দেখা যায় মো. সোহেল রানার সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দর-কষাকষি চলছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি ওই দামে পান বিক্রি করলেন না। চাষিরা মনে করেন, প্রতি বিড়া পানের দাম ৫০ টাকার বদলে অন্তত ৮০ টাকা হলে তাদের জন্য ভালো হতো।

ব্যবসায়ীদের মতে, পানের বাজারদর মূলত সরবরাহ ও চাহিদার ওপর নির্ভরশীল। পঞ্চগড়ে পান পাঠানোর দায়িত্বে থাকা আড়তদার মো. মাইনুল ইসলাম বলেন, হাটে পান বেশি এলে দাম কমে যায়; সরবরাহ কম থাকলে দাম বেড়ে যায়। ব্যবসায়ী মো. তজিবর উল্লেখ করেন, পানের মান ও মৌসুমের ওপরও দাম ওঠানামা করে। মোহনপুরের ব্যবসায়ী তৈবুর রহমানও একই মত পোষণ করে জানান, সরবরাহ ও চাহিদার পরিবর্তনের কারণেই দামে পার্থক্য দেখা দেয়। তাঁরা ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় পান সরবরাহ করেন।

চাষিরা আশা করছেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে দামের কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তাঁদের ব্যাখ্যা, বর্তমানে একটি পানগাছে ১৫ থেকে ১৬টি পাতা থাকলেও কিছুদিন পর তা কমে ছয় থেকে সাতটিতে নেমে আসবে। এ ছাড়া অনেকের বরজ পচে বা মরে যেতে পারে। দুর্গাপুরের চাষি মিজানুর জানান, কার্তিক থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত শীতের মৌসুমে উৎপাদন কমে গেলে প্রতি বিড়ার দাম ৮০ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে। তবে বছরের অন্য সময়ে কম দামে বিক্রি করে যে ক্ষতি হয়, তা পুষিয়ে নেওয়া কঠিন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় ৫ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে পান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৮৬ হাজার ৮২৪ মেট্রিক টন। গত বছর জেলার ৯টি উপজেলায় ৪ হাজার ৫০৯ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়েছিল, যেখানে উৎপাদিত হয়েছিল ৭৯ হাজার ৬৮১ মেট্রিক টন। কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, বর্ষায় পানের উৎপাদন বেশি হওয়ায় এ সময়ে দাম কিছুটা কম থাকে। তবে অন্য মৌসুমে কৃষকেরা তুলনামূলক ভালো দাম পান।